May 17, 2022, 6:57 am

বাড়তি আয় নিঃশেষ বাড়তি দামে

Spread the love

দেশে ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোটা চালের দাম ছিল গড়ে কেজিপ্রতি ২৬ টাকার কম। বাড়তে বাড়তে ২০২০-২১ অর্থবছরে একই চালের দাম ৫২ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তার মানে হলো, চালের দাম এই সময়ে দ্বিগুণ হয়েছে। একইভাবে ভোজ্যতেল, চিনিসহ নিত্যপণ্য এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই সময়ে শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। তবে এই বাড়তি আয় অনেকটা নিঃশেষ হয়ে গেছে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ে।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ভাষায় জনগোষ্ঠীর এই অংশ ছিল ‘শরীর নিমজ্জিত রেখে নাক ভাসিয়ে’। করোনাকালে তাঁদের আয় কমেছে। সম্প্রতি শুরু হয়েছে নিত্যপণ্যের চড়া দামের চাপ।

মানুষের জীবনযাত্রার মান তখনই উন্নত হয়, যখন ব্যয় বৃদ্ধির চেয়ে আয় বেশি হারে বাড়ে। তখন নিত্যপণ্য ও সেবা কেনার বাইরে মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনে বাড়তি ব্যয় করতে পারে। পুষ্টিকর খাবার খেতে পারে। ভালো বাসায় থাকতে পারে। আবার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয়ও করতে পারে।

বিবিএস বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত মজুরি হার সূচক (কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৪৪ পেশা ধরে হিসাব) বেড়েছে প্রায় ৮১ শতাংশ। বিপরীতে মূল্যসূচক বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। ক্যাবের হিসাবে ঢাকায় ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ৯৫ শতাংশ। আর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ।

মাথাপিছু আয়ের বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সে ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১০ সালে এই আয় ছিল ২ হাজার ৬৪০ ডলার (পিপিপি বা ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে), যা ২০২০ সালে ৫ হাজার ৩১০ ডলারে উন্নীত হয়। বৃদ্ধির হার ১০১ শতাংশ। মাথাপিছু আয়ে উন্নতির হিসাব করার ক্ষেত্রে ফাঁকি হলো এই যে, এতে বৈষম্যের চিত্রটি আসে না। দরিদ্রদের আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে ধনীদের আয় বৃদ্ধির কারণেও গড় মাথাপিছু আয় বাড়তে পারে।

একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। একজন ধনীর আয় মাসে ১২ লাখ টাকা। বিপরীতে শ্রমিকের মজুরি ৯ হাজার টাকা। দুজনের মাথাপিছু আয় কিন্তু দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪ হাজার ৫০০ টাকা। আয়কাঠামোর নিচের দিকে থাকা শ্রমজীবী মানুষেরাই মূলত এখন কষ্টে রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, শ্রমজীবী মানুষের আয় শতগুণ বাড়লেও তাতে কোনো লাভ নেই, যদি মূল্যস্ফীতি, অর্থাৎ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রকৃত মজুরি সেভাবে না বাড়ার কারণ কাজের খোঁজে থাকা মানুষের সংখ্যা বেশি, সে তুলনায় কর্মসংস্থান বাড়ছে না। দেশে যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাকে বলা হয় কর্মসংস্থানহীন।

বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি পড়ে উল্লেখ করে আকবর আলি খান বলেন, চালের দাম বাড়লে সচ্ছল মানুষদের অসুবিধা হয় না, কারণ তার আয়ের খুব সামান্য অংশ চালের পেছনে যায়। কিন্তু নিম্নবিত্তের আয়ের বড় অংশ যায় খাদ্য কিনতে।

উল্লেখ্য, বিবিএসের হিসাবে দেখা যায়, ২০১০ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। তা করোনার আগে কমে ২১ শতাংশে নামে (সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি)। অবশ্য করোনাকালে দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশে উঠেছিল বলে দাবি করেছিল বেসরকারি সংস্থাগুলো। সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে। যদিও নিজেরা কোনো জরিপ করেনি।

চাল-আটার দাম

বিবিএসের ২০০৯-১০ অর্থবছর ও গত জানুয়ারির গড় দাম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোজ্যতেলের দাম ৫৭, চিনি ৬৯, লবণ ৬৬, মুরগি (বড় একটি) ৯৯ ও গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ১৫৫ শতাংশ বেড়েছে।

চালের বিকল্প খাদ্য আটা। সেটার দামের হিসাব অবশ্য বিবিএসের পরিসংখ্যানে নেই। আরেক সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে দেখা যায়, ২০১০ সালের ৮ মার্চ এক কেজি প্যাকেটজাত আটা ছিল সর্বনিম্ন ২৩ টাকা। এখন তা সর্বনিম্ন ৪০ টাকা। মানে হলো, দাম বেড়েছে ৭৪ শতাংশ।

আরও পেছন তাকিয়ে দ্রব্যমূল্য কেমন ছিল, তা দেখা যাক। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি দুই টাকার মতো। মসুর ডালের দাম এর চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল, প্রতি কেজি ২ টাকা ২২ পয়সা। তখন সয়াবিন তেলের চল ছিল না, শর্ষের তেলের লিটার ছিল ১০ টাকার মতো (এখন ২৪০-২৯০ টাকা)। ক্যাবের হিসাবে, ২০০০ সালে ঢাকায় মোটা চালের কেজি ছিল সাড়ে ১৪ টাকা। আটাও মোটামুটি একই দরে পাওয়া যেত। ৩৯ টাকা লিটার দরে বিক্রি হতো সয়াবিন তেল। মসুর ডালের কেজি ছিল ৪০ টাকা।

পণ্যভেদে দাম বাড়ার কারণ ভিন্ন। ভোজ্যতেল, চিনি, ডালের মতো পণ্যের দাম বিশ্ববাজারের ওপর নির্ভরশীল। আবার উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণেও দাম বাড়ে। চালের উদাহরণ দেওয়া যাক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একদিকে চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে সরকার ঘোষণা দিয়েও চাল আমদানি করতে পারেনি। চালের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে রাখা হয়েছে। ফলে সুরক্ষিত বাজারে বেশি দাম আদায়ের সুযোগ পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

সংসারে চাল-ডাল কেনা যেমন অপরিহার্য, তেমনি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও বাসভাড়াও জরুরি সেবা। ক্যাবের হিসাব বলছে, ২০১০ সালের তুলনায় এখন এসব সেবার মূল্য দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। সম্প্রতি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওদিকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে বাসাভাড়া।

বিগত এক দশকে জীবনযাত্রার মান কতটুকু বেড়েছে, জানতে চাইলে ঢাকার শেওড়াপাড়ার একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক দম্পতি রিয়াজুল ইসলাম ও রেহানা আক্তার বলেন, আগেও সাভারে একটি টিনের ছাউনির বাড়িতে এক কক্ষ ভাড়া নিতে থাকতেন। এখনো তা–ই। সপ্তাহে ছয় দিন এবং ছুটির দিনেও আধবেলা কাজ করেও কোনোরকমে খেয়েপরে বেঁচে আছেন।

বাড়েনি প্রকৃত নিম্নতম মজুরি

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ‘বৈশ্বিক মজুরি প্রতিবেদন: ২০২০-২০২১’ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশভেদে নিম্নতম মজুরি ছিল ৪৮ ডলার (পিপিপি) থেকে ২ হাজার ১৬৬ ডলার। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল বাংলাদেশে (৪৮ ডলার)। আইএলওর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে নিম্নতম মজুরি আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে।

আইএলও আরও জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ২২ দেশে প্রকৃত নিম্নতম মজুরি বেড়েছে। কমেছে ৮টি দেশে। সবচেয়ে বেশি হারে প্রকৃত নিম্নতম মজুরি বেড়েছে ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ায়। আটটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে প্রকৃত নিম্নতম মজুরি কমেছে বাংলাদেশ (বছরে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ) ও শ্রীলঙ্কায়।

উল্লেখ্য, প্রকৃত মজুরি বাড়ার হার হিসাব করা হয় মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে। একজন শ্রমিকের মজুরি যদি ১০ টাকা বাড়ে, বিপরীতে নিত্যপত্রের দাম যদি ৬ টাকা বাড়ে, তাহলে প্রকৃত মজুরি বাড়ে ৪ টাকা।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল আলম মনে করেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ চাপে পড়ে, এটা চিরায়ত বিষয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে যে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে, তা তীব্রতর নয়। কারণ, আয় বৃদ্ধির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখনো মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি। প্রকৃত মজুরি বেড়েছে। মানুষ গ্রামে এখন কৃষিকাজে যে মজুরি পান, তা দিয়ে অন্তত ১২ কেজি চাল কেনা যায়। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি কাটাতে সরকার নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। অর্থনীতিতে যাতে গতি থাকে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, সে কারণে করোনাকালে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। দেশে ফেরত আসা কর্মহীন প্রবাসীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভাগ নিম্ন আয়ের মানুষের আরেকটু বেশি পাওয়া উচিত ছিল কি না—জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ন্যায়বোধ থেকে সেটা বলা যায়। তবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কালে দেশে দেশে বৈষম্য বেড়েছে। কোনো কোনো দেশ সেটাকে ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে, যেমন জাপান। তিনি বলেন, দেশে আয়বৈষম্য কমাতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়ার কাজ চলছে। দেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যে কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে মোটা চালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।

অবশ্য বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান হিসাব করে দেখান যে মূল্যস্ফীতি যেটা হয়েছে, তার কারণে প্রকৃত মজুরি বাড়েনি। তিনি বলেন, মজুরিসূচক হিসাব করা হয় ভিত্তিবছর ২০১০-১১ ধরে। আর মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয় ২০০৪-০৫ ভিত্তি বছর ধরে। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও ২০১০-১১ ভিত্তিবছর ধরলে দেখা যাবে, প্রকৃত মজুরি কমেছে। মূল্যস্ফীতি ও মজুরির ভিত্তিবছর একই হওয়া উচিত।

সেলিম রায়হান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয়। এ সময় মজুরি দিয়ে কত কেজি চাল কেনা যায়, তা বিবেচনা করা ঠিক নয়। শ্রমজীবী মানুষ কি মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ফলমূল খাবে না?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এই সম্পর্কিত আরো খবর...
العربية বাংলা English हिन्दी