May 18, 2022, 10:53 am

‘টিসিবির লাইনে দাঁড়ানো লজ্জার কিছু নয়’

Spread the love

পুরান ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজে পড়েন কমল হাসান। তাঁর বাবা আজিজ মল্লিক দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে কামরাঙ্গীরচরের একটি নার্সারিতে কাজ করেন। কমলদের টানাটানির সংসার। বাজার খরচ কিছুটা কমাতে কয়েক দিন ধরেই কমল তাঁর মাকে বলে আসছিলেন টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে। তবে ছেলে টিসিবির লাইনে দাঁড়াবেন, এটি মানতে কষ্ট হচ্ছিল মায়ের। ছেলেকে নিষেধ করলেও গোপনে মা ঠিকই টিসিবির ট্রাক থেকে একদিন পণ্য কিনেছিলেন।

টিসিবির লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মায়ের আপত্তির কথা জানিয়ে কমল বলেছেন, ‘মাকে আমি বলেছি, এই সব পণ্যে সরকার ভর্তুকি দেয়। টিসিবির লাইনে দাঁড়ালে কেন লজ্জা হবে। টিসিবির লাইনে দাঁড়ানো লজ্জার কিছু নয়।’

শেষ পর্যন্ত মাকে রাজি করিয়ে কমল নিজেই গতকাল (৩০ মার্চ) বুধবার দুপুরে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) লাইনে এসে দাঁড়ান। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর পণ্য হাতে পান তিনি। মা-বাবা, বোনসহ কমলদের পরিবারের সদস্য চারজন। ছোট বোন ক্লাস টুতে পড়ে। তাঁরা থাকেন কামরাঙ্গীরচরে দুই কক্ষের একটি ভাড়া বাসায়। মাসে ভাড়া চার হাজার টাকা।

কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রাম মেইন রোডে গতকাল টিসিবির ট্রাক এসে পৌঁছায় বেলা একটার দিকে। তখন সেখানে ৩৭ জন ছিলেন। এরপরও কে কার আগে লাইনে দাঁড়াবেন, এ নিয়ে হট্টগোল শুরু হয়। বেলা পৌনে দুইটার দিকে এ এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা (রিকশভ্যানে করে ফল বিক্রি করেন) ইসমাইল। টিসিবির ট্রাক দেখে তিনিও লাইনে দাঁড়ান। তিনি লাইনে দাঁড়ানো অবস্থাতেই শুনতে পান, ট্রাকে থাকা ওজন মাপার একটি যন্ত্র (তিনটি ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র ছিল) নষ্ট হয়ে গেছে। এটি শুনে তিনি টিসিবির পরিবেশকের বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে বলেন, তাঁর রিকশাভ্যানে একটি ওজন মাপার যন্ত্র রয়েছে। পরে নিজের ভ্যানে থাকা ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে বিক্রয়কর্মীদের সহায়তা করেন তিনি। বেলা আড়াইটার দিকে পণ্য হাতে পেয়ে মুখে হাসি ফোটে ইসমাইলের। বললেন, ভিড় কম থাকায় দ্রুত পণ্য পেয়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে থাকা ওজন মাপার যন্ত্রটিও কাজে দিয়েছে। তা না হলে আরও দেরি হতো। অবশ্য যাওয়ার সময় ওজন মাপার যন্ত্রটি তিনি নিয়ে যান।

কামরাঙ্গীরচরে গতকাল টিসিবির ট্রাক থেকে ছয় পণ্যের ৭২০ টাকার প্যাকেজ কিনতে হয়েছে ক্রেতাদের। এর মধ্যে ছিল খেজুর (এক কেজি ৮০ টাকা), চিনি (২ কেজি ১১০ টাকা), মোটা দানার মসুর ডাল (২ কেজি ১৩০ টাকা), সয়াবিন তেল (দুই লিটার ২২০ টাকা), ছোলা (২ কেজি ১০০ টাকা) ও পেঁয়াজ (চার কেজি ৮০ টাকা)।

নারীদের লাইনে থাকা অনেকেই পণ্য কেনার পর পেঁয়াজের মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্যাকেজে কেনা চার কেজি পেঁয়াজের মধ্যে প্রায় এক কেজি নষ্ট থাকছে বলে জানান তাঁরা।

কামরাঙ্গীরচরে গতকাল টিসিবির পরিবেশক ছিল সিগমা প্যাসিফিক। পেঁয়াজ নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগের বিষয়ে পরিবেশকের বিক্রয় প্রতিনিধি গোলাম হাক্কানি বলেন, যে পেঁয়াজ তাঁরা টিসিবির গুদাম থেকে আনেন, সেই পেঁয়াজই বিক্রি করেন।

নারীদের লাইনে কিছুক্ষণ পরপরই হট্টগোল হচ্ছিল। এর কারণ কেউ কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে বলতেন, তাঁর সঙ্গে আরও একজন বা দুজন আছেন। তাঁরা পরে আসবেন। এটি অনেকেই মানতে চাইতেন না। এরপর হট্টগোল শুরু হতো। লাইনে যাতে বিশৃঙ্খলা না হয়, সে চেষ্টা করছিলেন রুনা বেগম নামের এক নারী। স্বামী ও দুই সন্তান মিলে চারজনের সংসার রুনার। তাঁর স্বামী নির্মাণশ্রমিক।

রুনা বেলা দুইটার দিকে লাইনে দাঁড়ালেও পণ্য হাতে পান বিকেল পাঁচটার দিকে। এর কারণ নারীদের লাইনে ক্রেতার সংখ্যা পুরুষদের লাইনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ছিল। রুনা জানান, স্থানীয় একটি প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করেন। তাঁদের প্রতি সপ্তাহে বেতন দেওয়া হয়। তিনি পান ১ হাজার ৫০০ টাকা। আক্ষেপ করে বললেন, গত ঈদুল আজহার পর আর তাঁদের ঘরে গরুর মাংস রান্না হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এই সম্পর্কিত আরো খবর...
العربية বাংলা English हिन्दी