May 15, 2022, 8:26 pm

রমজানে ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ

Spread the love

পবিত্র রমজান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো এর একটি রাত—শবেকদরে মানবতার মুক্তির সনদ কোরআনে কারিম সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছে। কোরআনে কারিমের একাধিক জায়গায় তা উল্লেখ আছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, রাসুল (সা.)-এর ঐতিহাসিক মিরাজের ঘটনাও রমজান মাসে সংঘটিত হয়েছিল। এ ছাড়া ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বুকে ধারণ করে আছে এ রমজান মাস।

নিম্নে সে বিষয়ে আলোচনা করা হলো—

ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ

ইসলামের চিরস্মরণীয় ও গৌরবময় একটি অধ্যায় হলো বদর যুদ্ধ। মক্কার অদূরে বদর নামক স্থানে এ মাসেই সংঘটিত হয়েছিল ঈমান ও কুফরের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তথা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান এ প্রান্তরেই সংঘটিত হয়েছিল মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যকার এ ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র মুসলমানের মোকাবেলায় শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয় কাফির বাহিনীর সহস্রাধিক সশস্ত্র সৈন্যকে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সরাসরি তিন থেকে পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করা হয়। এ যুদ্ধে পৃথিবীর ইতিহাসে মহাবিপ্লব সাধিত হয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনে এ যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফোরকান’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বদর যুদ্ধে আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ মোট ৭০ জন কাফির নিহত হয়। আরো ৭০ জন কাফির মুজাহিদদের হাতে বন্দি হয়। অন্যদিকে ১৪ জন মুসলিম মুজাহিদ বীরবিক্রমে লড়াই করে শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন। বন্দিদের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর ক্ষমাসুলভ আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

মক্কা বিজয়

অষ্টম হিজরির ২০ বা ২১ রমজান জুমাবার রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম মক্কা বিজয় করেন। একসময় কাবাগৃহ ছিল বিশুদ্ধ একত্ববাদের কেন্দ্রস্থল। একমাত্র আল্লাহর বন্দেগির জন্য আল্লাহর নির্দেশে এটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। এটি মুশরিকদের দখলে থাকায় শিরকের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। রাসুল (সা.) তাওহিদের এ পবিত্র স্থানকে শিরকের নাপাকি থেকে মুক্ত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় প্রবেশ করে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলেননি। তিনি এ মর্মে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন—এক. যারা আপন ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে তারা নিরাপদ। দুই. যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে তারাও নিরাপদ। তিন. যারা কাবাগৃহে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ।

নাখলা নামক জায়গার মূর্তি অপসারণ

রাসুল (সা.) অষ্টম হিজরির ২৫ রমজান হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন নাখলা নামক জায়গার একটি বৃহদাকার মূর্তি অপসারণের জন্য। কাফিররা এর পূজা করত, যার নাম ছিল উজজা। খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) নিজ হাতে ওই মূর্তি অপসারণ করেন। এরপর তিনি বলেন, আর কখনো এখানে উজজার উপাসনা হবে না। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৪/৩১৬)

তায়েফে লাত নামক মূর্তি অপসারণ

নবম হিজরির রমজান মাসে তায়েফের সাফিফ গোত্র স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং তারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের উপাস্য ‘লাত’ নামক মূর্তি অপসারণ করে। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৫/৩১৬)

ঐতিহাসিক তাবুক যুদ্ধ

নবম হিজরির রজব মাসে তাবুক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় নবম হিজরির রমজান মাসে। (আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৩/১৬২৭)

তাবুক মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম। মদিনা থেকে এটি ৬৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এ যুদ্ধ ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে আরবের কাফির ও মুনাফিকদের শেষ চেষ্টা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রোমান ও আরবের কাফিরদের সমন্বয়ে ঘটিত যৌথ বাহিনীর রণপ্রস্তুতিই এ যুদ্ধের মূল কারণ। নবী করিম (সা.) মক্কা বিজয় ও হুনায়েনের যুদ্ধ শেষে যখন মদিনায় ফিরে এলেন, এর কিছুদিন পর সিরিয়া থেকে ফিরে আসা কিছু বণিক দলের কাছ থেকে খবর পেলেন, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদিনা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে সিরিয়া ও আরব সীমান্তে তারা এক বিশাল বাহিনী মোতায়েন করছে। রোম ছিল তৎকালীন দুনিয়ার বৃহৎ শক্তি। মহানবী (সা.) ফায়সালা করেন, হিরাক্লিয়াসের আক্রমণের অপেক্ষা না করে মুসলমানরা নিজেরাই আগে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। তিনি মদিনার সব মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরিক হওয়ার নির্দেশ দিলেন। পরে রোমানরা মুসলমানদের ভয়ে যুদ্ধ না করেই পলায়ন করেছে।

কাদেসিয়া যুদ্ধ

এক বর্ণনা অনুযায়ী কাদেসিয়া যুদ্ধ ১৫ হিজরি সনের রমজান মাসে সংঘটিত হয়। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমান ও রস্তুম ফাররাখজাদের নেতৃত্বে পারসিকদের মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তবে ইবনে কাছির (রহ.) তারিখ উল্লেখ ছাড়াই বলেছেন, এটা ১৪ হিজরি সনে হয়েছিল। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৯/৬১৩)

এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য ছিল সর্বসাকল্যে ৩৬ হাজার বা তার চেয়ে কিছু বেশি। আর কাফিরদের সৈন্য ছিল দুই লাখ। চার দিন ও তিন রাত প্রচণ্ড যুদ্ধ চলার পর কাদেসিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মাত্র ৩৬ হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ সুসজ্জিত পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে। এ যুদ্ধের ফলে ওই অঞ্চল ইরাকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং সেখানে ইসলামের প্রচার-প্রসারের সব বাধা দূরীভূত হয়। যুদ্ধের পর চার হাজার পারসিক সৈন্য সরাসরি ইসলাম গ্রহণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন গোত্র ও ইরাকে বসবাসরত ধর্মযাজকরা দলে দলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়।

স্পেন বিজয়

সিপাহসালার তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ৯২ হিজরি সনের ২৮ই রমজান সর্বপ্রথম রডারিকের সৈন্যকে পরাজিত করে স্পেন জয় করেন।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

সুলতান সালাহ উদ্দিন আইউবি (রহ.) ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করেন ১৩৯৩ সালের ১০ রমজান।

আইনে জালুতের যুদ্ধে বিজয়

৬৫৮ হিজরির ১৫ রমজান জুমাবার আইনে জালুত যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী তাতারিদের চিরতরে পরাজিত করে তাদের বলয় থেকে ইসলামী দেশগুলোকে মুক্ত করে।

ইহুদিদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন রক্ষার যুদ্ধ

ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের হাত থেকে পবিত্র করার জন্য সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ১৩৯৩ হিজরির ১০ রমজান। ফিলিস্তিনি বীর যোদ্ধারা অস্ত্র ও জনবলের দৈন্য সত্ত্বেও ইহুদিদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। যদিও পরবর্তীতে কিছু গাদ্দার ও দুনিয়ালোভী মুসলিম নেতাদের কারণে ইতিহাসের মোড় পাল্টে যায়। (আত-তারিখুস সিয়াসি লিদ্দাওলাতুল আরাবিয়্যা : ২/২০৪)। এ ছাড়াও আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি এই রমজানে সংঘটিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এই সম্পর্কিত আরো খবর...
العربية বাংলা English हिन्दी