করোনাকালে মৃত সন্তান প্রসব বেড়েছে

Spread the love

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি কোভিড ইউনিটে গত ২৭ জুলাই অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়াকে (২২) ভর্তি করা হয় । তাঁর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ছিল ৬০-৭০ শতাংশ। সুস্থ মানুষের অক্সিজেনের মাত্রা থাকে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশের মধ্যে। তাঁর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন থাকলেও সেখানে কোনো শয্যা খালি ছিল না। সাধারণ শয্যায় ১০ লিটার অক্সিজেন দেওয়ার পর রাবেয়ার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে মৃত সন্তান প্রসব করেন তিনি। এর দুই ঘণ্টা পর রাবেয়াও মারা যান।

রাবেয়া প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরামর্শক তামান্না রহমান বলেন, এসব ক্ষেত্রে মায়ের অক্সিজেনের ঘাটতি হলে গর্ভের সন্তানও কম অক্সিজেন পেতে থাকে। ফলে মায়ের সঙ্গে সন্তানেরও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। করোনাকালে গাইনি কোভিড এবং নন-কোভিড ইউনিটে তিনি বেশ কিছু মৃত সন্তান প্রসবের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বলে জানান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রসবসংখ্যার তুলনায় ২০১৯ সালের চেয়ে করোনাকালে মৃত সন্তান প্রসব বেড়েছে। ২০১৯ সালে মৃত সন্তান জন্মের হার ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ ছিল। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে এ হার ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। এ সময়ে সরকারি সেবাকেন্দ্রগুলোতে প্রসবের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

করোনাকালে চিকিৎসাসেবার ঘাটতি এবং অনেক মা কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার কারণেও মৃত সন্তান প্রসবের ঘটনা বেড়েছে বলে চিকিৎসকেরা মনে করেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ-সংক্রান্ত তথ্যে কোভিডের বিষয়টি আলাদা করা নেই।

‘টিকা দেওয়া থাকলে মৃত্যু হয়তো কম হতো’

জাতীয় টিকা পরামর্শক কমিটি ২ আগস্ট অন্তঃসত্ত্বা ও দুগ্ধদানকারী মাকে করোনাভাইরাস টিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ-চিকিৎসকদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) টিকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা কমিটির কাছে তুলে ধরে।

বারডেম হাসপাতালের প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক এবং ওজিএসবির সভাপতি ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কোভিড সংক্রমণের হার কম। আর সংক্রমিত হলেও মৃত্যুঝুঁকি কম। তাই অন্তঃসত্ত্বাদের আগে থেকেই টিকার আওতায় আনা গেলে মাতৃমৃত্যু, মৃত সন্তান জন্ম এবং নবজাতক মৃত্যু হয়তো কম হতো।’ তিনি বলেন, করোনাকালে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক অবস্থা, মানসিক অবস্থা—সবই নিম্নমুখী। মায়ের স্বাস্থ্যে এসব প্রভাব ফেলে।

মৃত সন্তান জন্মের কারণ সম্পর্কে অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, সংক্রমণ, জন্মগত বিকলাঙ্গতার কারণে মৃত শিশু প্রসবের ঘটনা ঘটে থাকে। আর নবজাতক মৃত্যুর বড় কারণ অপরিণত বয়সে প্রসব হওয়া। করোনায় আক্রান্ত মায়ের মৃত সন্তান জন্ম ও অপরিণত বয়সী শিশু জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বেশি।

উল্টো চিত্র ডিজিএফপি সেবাকেন্দ্রে

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) অধীনে সারা দেশে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র ৩ হাজার ৩৬৪টি। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৮৩টি, উপজেলা পর্যায়ে ১২টি ও জেলা পর্যায়ে ৬০টি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে এবং জাতীয় পর্যায়ে তিনটি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) তথ্য অনুসারে, ২০১৯ সালের তুলনায় করোনাকালে অন্তঃসত্ত্বাদের সেবা নেওয়ার হার কমেছে। সেই সঙ্গে মৃত সন্তান জন্ম, নবজাতক মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু—তিনটিই কমেছে। ২০১৯ সালে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯৬২ প্রসবের মধ্যে মৃত সন্তান জন্ম ১ হাজার ২০২, নবজাতক মৃত্যু ২৩৯ এবং মাতৃমৃত্যু ছিল ২ হাজার ৪৮০। ২০২০ সালে ১ লাখ ৭৪ হাজার ২৬৩ প্রসবের মধ্যে মৃত সন্তান জন্ম ৮৮৯, নবজাতক মৃত্যু ১২৬ এবং মাতৃমৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২১২। আর চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৮৩ হাজার ৭৬৪ প্রসবের মধ্যে মৃত সন্তান জন্ম ৩৫১, নবজাতক মৃত্যু ২৯ এবং মাতৃমৃত্যু হয়েছে ২৯৯।

জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা) মোহাম্মদ শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনাকালে ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রে কোভিডসহ অন্যান্য কারণে জটিল অবস্থা নিয়ে যেসব অন্তঃসত্ত্বা নারী এসেছিলেন, তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ কারণে এখানে মৃত্যুর ঘটনা আগের চেয়ে কম ঘটেছে।’

মোহাম্মদ শরীফ বলেন, করোনাকালের প্রথম দুই মাস ভীতি অনেক বেশি ছিল। চিকিৎসকেরাও রোগী ধরতে ভয় পেতেন। বাড়িতে অনেক বেশি প্রসবের ঘটনা ঘটেছে। এখন স্বাস্থ্যসেবা একটি কাঠামোর মধ্যে চলে এসেছে। মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রেও কোভিডে আক্রান্ত মায়ের সিজারিয়ান সেকশন করা হচ্ছে। করোনাকালের শিক্ষা নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে মা ও শিশুমৃত্যু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই সম্পর্কিত আরো খবর...
العربية বাংলা English हिन्दी