৫জি প্রকল্পে তেল খরচ দেড় কোটি টাকা!

Spread the love

সারা দেশে ৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্পের আওতায় দেড় কোটি টাকার অয়েল অ্যান্ড লুব্রিকেন্ট ব্যয়ের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। এমন প্রস্তাবের কারণ ব্যাখ্যা করতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আওতায় ৩৬ মাসের জন্য ১২টি যানবাহন ভাড়া বাবদ ৩ কোটি ৮৯ লাখ, ৮টি মোটরসাইকেলসহ ১১টি মোটরযান ক্রয় বাবদ ২ কোটি ৬৯ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব বিষয়েও জানতে চেয়েছে কমিশন।

প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিটিসিএল। চলতি মাসেই প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য কার্যপত্র তৈরি করেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। কার্যপত্রে থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

‘৫জি’র উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সাল মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন সর্বাধুনিক টেলিযোগাযোগ ও আধুনিক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং বর্ধিষ্ণু চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বিটিসিএল এর অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নতকরণ এবং সম্প্রসারণ।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্মপ্রধান (যোগাযোগ) মো. আতাউর রহমান খান বাংলানিউজকে বলেন, বিটিসিএল পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) পাঠিয়েছে। চলতি মাসেই পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রকল্পের আওতায় অয়েল অ্যান্ড লুব্রিকেন্টসহ নানা খাতের ব্যয় প্রস্তাব বেশি করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। সামনে পিইসি সভায় এসবের কারণ জানতে চাওয়া হবে। যতোটুকু ব্যয় হওয়া প্রয়োজন ততটুকুই দেওয়া হবে। প্রয়োজনে রেট সিডিউল দেখা ও বর্তমান বাজারদর দেখা হবে। ব্যয় প্রস্তাবের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক হলে তখন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিটিসিএল- এর প্রস্তাবিত প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশন মতামত প্রকাশ করে জানায়, সম্ভাব্যতায় সমীক্ষায় বৈদেশিক মুদ্রা বাবদ ৪৮৬ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হলেও ডিপিপিতে তা কমিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্ভাব্যতায় সমীক্ষায় বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়ের জন্য প্রস্তাবিত একটি আইটেম (অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল সাবমেরিক ৪৮ কোর) স্থানীয় মুদ্রায় ক্রয়ের সংস্থান রাখার কারণ কমিশনকে অবহিত করা যেতে পারে।

প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ওভারসিজ টেকনলজি অপারেশনে ৩০ জনের জন্য ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং প্রযুক্তি বিষয়ক ওয়ার্কশপের জন্য ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। যার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সম্ভাব্যতার সমীক্ষা প্রতিবেদনে কন্সালটেন্সি বাবদ ১০ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে যা প্রস্তাবিত ডিপিপিতে কমিয়ে ২৪০ জনমাসের জন্য ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। কিন্তু এ খাতের অবশিষ্ট অর্থ মোট প্রকল্প ব্যয় হতে বাদ না দিয়ে ডিপিপি’র অন্য অঙ্গে অন্তভূক্ত করার কারণ সভাকে অবহিত করা যেতে পারে।

প্রস্তাবিত ডিপিপির মূলধন অংশে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির সাথে অফিস ইকুপমেন্ট, প্রকল্প অফিস এবং আঞ্চলিক সাইটসমুহের জন্য কম্পিউটার প্রিন্টার ইত্যাদির সংস্থান রাখা হয়েছে। রাজস্ব অংশ কম্পিউটার সামগ্রী বাবদ আলাদাভাবে ৮ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির অংশ হতে উক্ত ব্যয়সমূহ বাদ দিয়ে পৃথকভাবে ব্যয় প্রাক্কলন করা যেতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশন মতামত প্রকাশ করে জানায়, অর্থ বিভাগে জনবল নির্ধারণ কমিটির সভায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পর্যায়ে ৩৯ জন জনবলের সুপারিশ করা হয়। তখন প্রকল্পের মেয়াদ ছিল অক্টোবর ২০১৮ হতে সেপ্টেম্বর ২০২১ এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩৬৮ কোটি টাকা। উক্ত মেয়াদ ইতোমধ্যে সমাপ্ত হওয়ার পথে এবং ব্যয়ও প্রায় ৩০০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে জনবল নিয়োগে কোন অসুবিধা হবে কিনা এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত প্রয়োজন বলে দাবি কমিশনের।

বিটিসিএল সূত্র জানায়, জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন ও বিশ্বব্যাপী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপ্লব ও উন্নয়ন সংঘটিত হয়েছে। সেই উন্নয়নের ধারায় সামিল হতে ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরে নিজেদের জন্য জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, তথ্য প্রবাহে প্রতিযোগিতার কারণে ব্রডব্যান্ড যোগাযোগ মাধ্যম আইসিটিভিত্তিক আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধিতে একটি প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ব্রডব্যান্ড যোগাযোগের মাধ্যমের কানেকটিভিটি, নির্ভরযোগ্যতা, ব্যান্ডউইথ এবং ল্যাটেন্সি প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের ইন্টারনেট পেনেট্রেশন ১৩ শতাংশ, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বেশ কম। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হওয়ার জন্য সারা বাংলাদেশে ইন্টারনেটের পেনেট্রেশন প্রায় ৯০ শতাংশ হতে হবে। বর্তমানে দেশে ৬ লক্ষ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করছেন, যাদের মধ্যে ১১ শতাংশ নারী। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মোট আন্তর্জাতিক শেয়ারে বাংলাদেশের ১৬ শতাংশ অবদান রয়েছে, যা সারাবিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়। এই পেশায় নারীদের অবদান বাড়াতে হলে আরও অনেককে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই অর্জন কেবলমাত্র তখনি সম্ভব হবে যখন দেশের প্রতিটা কোণে অবস্থানরত শিক্ষিত তরুণ নারী সমাজকে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব হবে ।

প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হচ্ছে বিটিসিএল এর ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ককে নিরবচ্ছিন্ন করার জন্য সমগ্র বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা ব্যাকআপ অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল লিংক সুবিধার আওতায় আনয়ন ও ঢাকা মেট্রোতে ব্যাকআপ লিংক তৈরি করা। বর্তমান ৪জি নেটওয়ার্কের চাহিদা বৃদ্ধি, আসন্ন ৫জি নেটওয়ার্কের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ককে আধুনিকীকরণের জন্য দেশব্যাপী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, বগুড়া, রংপুর, খুলনা এবং বরিশালে ক্লাস্টার স্থাপন করা হবে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যন্ত উচ্চগতির ব্যান্ডউইথ বিতরণে প্রযোজনীয় যন্ত্রপাতি, রাউটার, মডিউল ইত্যাদি স্থাপন করা হবে। ব্যাক আপ রিং নেটওয়ার্কের জন্য দেশব্যাপী ১৪৬টি ওএফসি লিংক (আন্ডারগ্রাউন্ড) এবং ৮টি ওএফসি লিংক (সাবমেরিন) স্থাপন করা হবে। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হবে ৩ হাজার ১৪৪ কিলোমিটার এবং ওএফসি স্থাপন করা হতে ৩৯ কিলোমিটার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই সম্পর্কিত আরো খবর...
العربية বাংলা English हिन्दी