ভারতের কারাগারে কুতুবদিয়া সহ দেশের অর্ধশতাধিক জেলে বন্দি!

আবির হোসেন সানি
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

ভারতের কারাগারে কুতুবদিয়া সহ দেশের অর্ধশতাধিক জেলে বন্দি!

কক্সবাজার প্রতিনিধি:আবির হোসেন সানি

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জলসীমা অতিক্রম করার অভিযোগে কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, ভোলা ও আশপাশ এলাকার অন্তত অর্ধশতাধিক জেলেকে গ্রেপ্তার করে ভারতের কোস্ট গার্ড কারাগারে পাঠিয়েছে—এমন দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা। কয়েকজন জেলে ভারতের কারাগার থেকে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বললেও অনেকে এখনো ‘লোকমুখে’ খবর শুনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।

গত দুই সপ্তাহে একাধিক দফায় এসব জেলে আটক হয়েছেন।

১০ নভেম্বর → ভোলার লালমোহন উপজেলার ১৩ জেলে

১৯ নভেম্বর → কুতুবদিয়া উপজেলার ২৮ জেলে

১৯ নভেম্বর → কুতুবদিয়া ও বাঁশখালী মিলে ২৬ জেলে

৩০ নভেম্বর → কুতুবদিয়ার আরও ১৫ জেলে

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অতীতে দুই দেশের কোস্ট গার্ড ও প্রশাসনিক আলোচনার মাধ্যমে বহু জেলে নিজ দেশে ফিরেছেন।

ছেলের মুখ দেখতে চান মা

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার মানুষের প্রধান জীবিকা মাছ ধরা। কিন্তু বৈরি আবহাওয়া ও কুয়াশায় বিভ্রান্ত হয়ে অনেক সময় জেলেদের ট্রলার ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়ে। তখনই ঘটে গ্রেপ্তারের ঘটনা।

গত দুই সপ্তাহে কুতুবদিয়ার অন্তত ৫৬ জেলে ভারতের কারাগারে বন্দি হয়েছেন। অধিকাংশ পরিবারেই তিনি একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় জেলেপল্লীগুলোতে নেমেছে কান্না ও দুশ্চিন্তার ছায়া।

৩০ নভেম্বর ভারতীয় কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হন শিপঙ্কর দাশ। সংসারের বড় ছেলে মারা যাওয়ার পর পরিবারকে তিনিই সামলাতেন। তার মা নয়ন রানী দাশ বলেন—
“সে আমাদের ছয়জনকে দেখত… জানি না কবে ছেলের মুখ দেখতে পাব।”

আরেক জেলে বেণু বাঁশি জলদাশের স্ত্রী বিপু রানী বলেন—
“স্বামী ছাড়া ঘরটা অন্ধকার। সে অসুস্থ ছিল, তারপরও পরিবারের জন্য সাগরে গেছে।”

১৯ নভেম্বর আটক হওয়া জেলে এনামুল হকের বাবা মোহাম্মদ রফিক বলেন—
“তারা পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতেই সাগরে গেছে। সরকার চাইলে তাদের ফেরাতে পারে।”

কীভাবে আটক হলেন?

৩০ নভেম্বর ভারতীয় গণমাধ্যম দি হিন্দুর প্রতিবেদনে জানানো হয়, বঙ্গোপসাগর থেকে যাওয়া কুতুবদিয়ার ‘এমবি আল্লাহ মালিক’ ট্রলারটি পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক করে কোস্ট গার্ড। পরে ট্রলারসহ জেলেদের ফ্রেজারগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আটক হওয়া ১৫ জেলের মধ্যে আছেন—
আব্দুর রাজ্জাক, বেণু বাঁশি জলদাশ, ফয়েজ, মোস্তাক আহম্মদ, নাজিম উদ্দীন, সর্বানন্দ জলদাশ, সম্রাজ দাশ, মো. কাইছার, নিবজল দাশ, আব্দুস ছালাম, আইয়ুব খান, আব্দুল আলিম, শিপংকর দাশ, শামীম উদ্দিন ও লিবজল দাশ।

এর আগে কুয়াশায় দিকভ্রান্ত হয়ে কুতুবদিয়ার নজরুল ইসলামের মালিকানাধীন ট্রলারটি ২৮ জেলেসহ আটক হয়। ট্রলারের মাঝি ভারতীয় কোস্ট গার্ডের একজনের মোবাইল ব্যবহার করে বিষয়টি স্বজনদের জানান। একই দিন বাঁশখালীর ‘এমভি মায়ের দোয়া’ ট্রলারটি মাঝসমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল হয়ে পথ হারালে সেটিও আটক হয়—যেখানে কুতুবদিয়ার ১৩ জনসহ ২৬ জেলে ছিলেন।

প্রশাসনের তৎপরতা

কুতুবদিয়ার ইউএনও কাথোয়াইপ্রু মারমা জানান—
“আটকদের পরিচয় নিশ্চিত করতে নথি সংগ্রহ করা হয়েছে, প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।”

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন—
“পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জেলেদের ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।”

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ভারত ৯০ জন বাংলাদেশি জেলেকে ফেরত পাঠিয়েছিল; বাংলাদেশও ৯৫ ভারতীয় জেলে হস্তান্তর করে।

 

২১ দিন পর ভোলার ১৩ জেলের সন্ধান

ভোলার লালমোহন উপজেলার ১৩ জেলের পরিবার ২১ দিন পর স্বজনদের জীবিত থাকার খবর পেয়েছে। ভারতীয় কারাগার থেকে তাঁরা ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন।

মো. হেলালের স্ত্রী মিতু বেগম বলেন—
“২১ দিন পর স্বামীর কল পেয়েছি। তিনি বলেছেন, তারা সবাই ভারতের একটি কারাগারে আছেন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া—এখন সরকার যেন দ্রুত ফিরিয়ে আনে।”

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি ও স্বজনরা সরকারের কাছে দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।

লালমোহন থানার ওসি মো. সিরাজুল ইসলাম জানান—
“সম্ভবত তারা সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ভারতের জলসীমায় ঢুকে পড়েন। প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

 

সাগরে জীবিকার সন্ধানে নেমে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া এসব জেলে আজ বিদেশের কারাগারে বন্দি। অর্ধশতাধিক পরিবারের স্বপ্ন, অশান্তি আর অপেক্ষা এখন সরকারের কার্যকর তৎপরতার ওপর নির্ভর করছে। স্বজনদের চোখে একটাই চাওয়া—
“আমাদের সন্তান, স্বামী, ভাইকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনুন।

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন