দুই দিনে চার খুনের মামলায় সাজ্জাদ ও তাঁর স্ত্রীর জামিন জামিনের খবর আড়াল করতে নেওয়া হয় নানা কৌশল

আবির হোসেন সান
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ১০:৩০ অপরাহ্ণ

হাইকোর্ট থেকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাত্র দুই দিনে চাঞ্চল্যকর চারটি খুনের মামলায় জামিন পেয়েছেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ এবং তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না। পুলিশ, প্রশাসন ও সাংবাদিকদের কাছ থেকে জামিনের তথ্য গোপন রাখতে পদে পদে নানা কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আর চাপা থাকেনি।

সাজ্জাদ হোসেনের বিরুদ্ধে রয়েছে ১০টি খুনসহ মোট ১৯টি মামলা। এর মধ্যে চট্টগ্রামের জোড়া খুন এবং প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলার আলোচিত হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত। তাঁর স্ত্রী তামান্না’র বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক খুনসহ মোট আটটি মামলা।

চার মামলায় জামিনের সময়সূচি

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চান্দগাঁও থানার দোকানকর্মচারী শহিদুল ইসলাম হত্যা মামলায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর সাজ্জাদ ও তামান্নাকে জামিন দেন হাইকোর্ট। একই দিনে হাইকোর্টের একই বেঞ্চে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট পাঁচলাইশ থানার ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলায় এ দম্পতিসহ তিনজনকে জামিন দেওয়া হয়।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে, ২২ সেপ্টেম্বর একই বেঞ্চ ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট পাঁচলাইশ থানার দোকানকর্মচারী মো. ফারুক হত্যা মামলায় এবং একই দিন পাঁচলাইশ থানার আফতাব উদ্দিন তাহসীন হত্যা মামলাতেও সাজ্জাদ ও তামান্নাকে জামিন দেন।

চারটি মামলাতেই রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি ইউসুফ আবদুল্লাহ সুমনের দ্বৈত বেঞ্চ জামিন মঞ্জুর করেন। যদিও ১৫ ও ২২ সেপ্টেম্বর জামিন দেওয়া হয়, তবে হাইকোর্টের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলী যথাক্রমে ১৮ সেপ্টেম্বর ও ৫ অক্টোবর জামিন আদেশে স্বাক্ষর করেন। সেই আদেশ চট্টগ্রাম আদালতে পৌঁছায় প্রায় আড়াই মাস পর, ৮ ডিসেম্বর।

জামিন নিয়ে লুকোচুরি

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তিন মাস আগে জামিন পেলেও সঙ্গে সঙ্গে জামিননামা চট্টগ্রাম আদালত কিংবা কারাগারে পাঠানো হয়নি। বরং পদে পদে লুকোচুরির কৌশল অবলম্বন করা হয়। হাইকোর্টে নারী হিসেবে সহানুভূতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে চারটি মামলাতেই তামান্নার নাম রাখা হয় এক নম্বরে, আর সাজ্জাদের নাম রাখা হয় দুই ও তিন নম্বরে। এতে সাজ্জাদের শীর্ষ সন্ত্রাসী পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সাধারণত হাইকোর্ট থেকে জামিন হলে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যেই জামিননামা কারাগারে পৌঁছে আসামি মুক্তি পান। এমনকি ভয়ংকর বা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার জজ আদালতে গিয়ে জামিন স্থগিতের আবেদন করে থাকে। তবে এই চারটি মামলায় তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আইনজীবী ও কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

সাজ্জাদের আইনজীবী আবু বক্কর সিদ্দিক জামিনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “কারাবন্দি সাজ্জাদ ও তামান্না চারটি মামলায় জামিন পেয়েছেন। জামিননামা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হাইকোর্ট থেকে কেন দেরিতে চট্টগ্রামে এসেছে—এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।”

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার শাহ সৈয়দ শরীফ জানান, সাজ্জাদ হোসেনের বিরুদ্ধে মোট ১৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলার জামিননামা এসেছে। তাঁর স্ত্রী তামান্নার চারটি মামলার জামিননামা পাওয়া গেছে। সাজ্জাদ বর্তমানে রাজশাহী এবং তামান্না ফেনী কারাগারে থাকায় সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ওই দুই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

দেরির নেপথ্য কারণ

হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার কিছুদিন পরই সাজ্জাদের প্রতিপক্ষ আরেক সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলা খুন হন। এরপর সাজ্জাদকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে প্রশাসনের কড়া নজর পড়ে। এই পরিস্থিতিতে জামিনের বিষয়টি আড়াল করতে হাইকোর্ট থেকে ধীরগতিতে জামিননামা চট্টগ্রামে পাঠানোর কৌশল নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। সাধারণত আদালতে জামিননামা পৌঁছানোর পর আসামিপক্ষের ‘জামিন বন্ড’ না দেওয়া পর্যন্ত কাগজ কারাগারে পাঠানো হয় না। সেই বন্ড দিতেই সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর অবশেষে ৮ ডিসেম্বর একসঙ্গে চারটি খুনের মামলার জামিননামা কারাগারে পাঠানো হয়।

কেন রাজশাহী ও ফেনী কারাগারে স্থানান্তর

গত ৫ নভেম্বর নির্বাচনী প্রচারের সময় বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পেছনে কারাগারে বসেই ফোনে সাজ্জাদের অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে। এরপর ১৪ নভেম্বর সাজ্জাদকে রাজশাহী এবং ১৮ নভেম্বর তামান্নাকে ফেনী জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

এর আগে ঢাকার বসুন্ধরা সিটি থেকে গ্রেপ্তারের পর সাজ্জাদ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বাবলাকে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দিয়েছিলেন তামান্না। এর কিছুদিন পরই প্রকাশ্যে গুলি করে বাবলাকে হত্যা করা হয়—যা পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন