লজিং মাস্টার থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক খাগড়াছড়িতে দখল ও দুর্নীতির বিস্ময়কর উত্থান

আবির হোসেন সান
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ৭:৩১ অপরাহ্ণ

লজিং মাস্টার থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক—শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে এমনই এক বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে মো. সেলিমের। অভিযোগ রয়েছে, অন্যের জমি জবরদখল, ঠিকাদারি কাজে অনিয়ম ও নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার রয়েছে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী, যাদের মাধ্যমে অস্ত্রের মুখে মানুষকে জিম্মি করে জমি ও ঘরবাড়ি দখল করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নোয়াখালীর এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম সেলিমের। তার বাবা ও ভাই একসময় টিউবওয়েল মিস্ত্রির কাজ করতেন। সেলিম অন্যের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। নম্র ও ভদ্র আচরণের সুবাদে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি পার্বত্য জেলা পরিষদের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ হন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতে করতে ওই কর্মকর্তার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।
একপর্যায়ে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প তদারকির দায়িত্ব পান সেলিম। সেই সুযোগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে কমিশন বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। পরে ওই কর্মকর্তার সরলতার সুযোগ নিয়ে নিজের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাগিয়ে নেন। নিম্নমানের কাজ করে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে অল্প সময়েই কোটিপতি বনে যান তিনি।
২০১৮ সালে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের ঠিকাদারি কাজ পেয়ে কার্যত কোনো কাজ না করেই প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অবৈধ আয়ে খাগড়াছড়ি সদরের আদালত সড়কে প্রায় তিন একর জায়গায় গড়ে তুলেছেন ‘সেলিম ট্রেড সেন্টার’ নামে একটি বিশাল শপিংমল, যার ব্যয় হাজার কোটি টাকা বলে স্থানীয়দের দাবি। এছাড়া পূর্ব শান্তিনগরে রয়েছে তার বিলাসবহুল বাড়ি।
দীঘিনালা উপজেলার জামতলী এলাকার ভুক্তভোগী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মৌখিক চুক্তিতে সেলিমের সঙ্গে জমি কেনাবেচার লেনদেনের পর জমির ভোগদখল বুঝিয়ে দিই। পরে আমাকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে ২৫০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করি। এরপর জোর করে ৫০ লাখ টাকার পাঁচটি চেকেও স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় আমি দীঘিনালা থানায় মামলা করেছি।
রফিকুল আরও দাবি করেন, সেলিম রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবাদী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমপি-মন্ত্রী, মেয়র ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে সরকারি টেন্ডার বাগিয়ে নিতেন। টেন্ডার বাণিজ্যের অর্থ চার ভাগে ভাগ করে ‘উপর মহলে’ পাঠানো হতো। ক্ষমতার পালাবদলের পর নিজেকে বিএনপিপন্থি দাবি করলেও বর্তমানে তিনি জামায়াতের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কাজ করছেন।
এছাড়াও খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার রশিকনগরের মৃত আবদুল জব্বারের ছেলে কালু মিয়া, পশ্চিম বেতছড়ির সিরাজুল ইসলামসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তির জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগে সেলিমের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে সাইদুর রহমানের ১১ একর জমি, মাহাবুব আলমের ঘরবাড়ি ও জমি জবরদখল করা হয়েছে।
তার ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মতিরঞ্জন ত্রিপুরা, খলিল, মনির হোসেন, আহমেদ শরিফ ও জহিরুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে। তাদের ভয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
দীঘিনালার বাসিন্দা আইনুক বিবি অভিযোগ করে বলেন, আমার জমির দলিল জাল করে সেলিম জমি দখল করেছে। আমি কারও কাছে জমি বিক্রি করিনি। মামলা করলেও টাকার প্রভাবে বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে। আমরা তার হাত থেকে মুক্তি চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে মো. সেলিম বলেন, পাহাড়ি ও বাঙালিদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে জমি দখল ও ঠিকাদারি অনিয়মের যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তবে ‘লজিং মাস্টার থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক কীভাবে হলেন’—এ প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, “আপনি এসব নিয়ে প্রশ্ন করার কে?”—বলেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন