নিজের ফেসবুক আইডিতে হৃদয়বিদারক এক স্ট্যাটাস দিয়ে মুহূর্তেই নেট দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছেন চকরিয়ার যুবক নিশান। সেই স্ট্যাটাসে উঠে এসেছে বিচার, বঞ্চনা, দীর্ঘ কারাবন্দিত্ব আর একটি ভাঙা সংসারের নিদারুণ বাস্তবতা।
নিশানের দাবি অনুযায়ী, তার স্ত্রী টানা ৩ বছর ৩ মাস ধরে জেল হাজতে কারাবন্দি। একমাত্র অপরাধ—স্বামীর সংসারের পাশে দাঁড়ানো।
ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে নিশান লেখেন—
“আমার জীবনের শেষ কথাগুলো আপনাদের মাঝে রেখে গেলাম।
অপেক্ষার প্রহর চলছে আজ ৩ বছর ৩ মাস।”
নিশানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী শুধুমাত্র সংসারের জন্য এত দীর্ঘ সময় কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।
হাইকোর্টে জামিন, জেলা জজ কোর্টে প্রত্যাখ্যান
দীর্ঘ তিন বছর পর হাইকোর্ট তার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ও দীর্ঘ কারাবন্দিত্ব বিবেচনায় বিশেষভাবে জামিন মঞ্জুর করেন।
হাইকোর্টের আদেশে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—
“মেয়েটির বয়স যাচাই করে জেল হাজত থেকে মুক্তি দিতে হবে।”
নিশানের স্ত্রী আদালতে জবানবন্দিতে বলেন, তার জন্ম সাল ১০ জুলাই ২০০৬।
কিন্তু কক্সবাজার জেলা জজ আদালতে হাজির করার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
আদালত বারবার গুরুত্ব দেয় পরিবারের পক্ষ থেকে দেখানো জন্মসনদ ও টিকার কার্ডে, যেখানে জন্ম সাল দেখানো হয় ২০১০।
নিশানের পক্ষ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই দাবি করা হয়—এই টিকার কার্ড মিথ্যা ও বানোয়াট।
টিকার কার্ড মিথ্যা প্রমাণিত, তবুও মুক্তি নয়
নিশানের আইনজীবী, জেলা জজ আদালতের অ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক খান কায়ছার, আদালতে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন—
টিকার কার্ডটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
আদালত তখন নির্দেশ দেয়, যদি টিকার কার্ড মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অভিযুক্ত নারীকে মুক্তি দেওয়া হবে।
এরপর আদালতের চিঠিতে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তদন্ত হয়।
প্রায় এক সপ্তাহ পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান লিখিত প্রতিবেদনে আদালতে উপস্থিত হয়ে স্পষ্টভাবে জানান—টিকার কার্ডটি তাদের তৈরি নয় এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
এই রিপোর্টে আশার আলো দেখেছিলেন নিশান। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো স্ত্রীর বন্দি জীবনের অবসান হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—কোনো মুক্তি নয়।
জন্ম নিবন্ধন নিয়ে নতুন বিতর্ক
পরবর্তীতে আদালত বারবার গুরুত্ব দিতে থাকে ২০১৭ সালে সংশোধিত জন্ম নিবন্ধনকে, যেখানে জন্ম সাল দেখানো হয় ২০১০।
নিশানের প্রশ্ন—
যেখানে একটি টিকার কার্ড মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত,
সেখানে সেই টিকার কার্ডের ভিত্তিতে করা জন্ম নিবন্ধন কীভাবে সত্য হয়?
কারণ নিয়ম অনুযায়ী—
টিকার কার্ড ছাড়া জন্ম নিবন্ধন করা যায় না।
তারপরও সংশোধিত জন্ম নিবন্ধনকে প্রাধান্য দিয়ে নিশানের স্ত্রীকে নাবালিকা ঘোষণা করে আবারও জেল হাজতে পাঠানো হয়।
আদালতে স্ত্রীর আকুতি, কেউ শোনেনি
নিশানের স্ত্রী আদালতে হাতজোড় করে বলেন—
“মাননীয় বিচারক, আমি আল্লাহর শরীয়ত মেনে একটি সংসারের জন্য তিন বছর জেল হাজতে আছি।
আল্লাহ নারীদের জন্য সংসার রক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
আমি আল্লাহকে ভয় করে এই কষ্ট সহ্য করছি।”
এই বক্তব্যকেও কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ নিশানের।
ভেঙে পড়া পরিবার, হারিয়ে যাওয়া সবকিছু
নিশানের অভিযোগ, এই মামলার কারণে তিনি সর্বস্ব হারিয়েছেন—
ছোট ভাই হারিয়েছে সরকারি চাকরি
হৃদরোগে আক্রান্ত মায়ের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে মিথ্যা মামলা
বৃদ্ধ বাবাকেও করা হয়েছে আসামি
পরিবারের সবাই মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও তিনি ও তার স্ত্রী রয়ে গেছেন বন্দিত্বে
২০ দিনের আল্টিমেটাম, যাবজ্জীবনের শঙ্কা
নিশান জানান, আর মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই মামলার চূড়ান্ত রায়।
অভিযোগ—অপহরণ ও ধর্ষণ।
যদিও তার স্ত্রী নিজেই তার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন,
কিন্তু নাবালিকা দেখানো হওয়ায় আইন অনুযায়ী সেই সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
নিশানের দাবি, একজন বিচারক তাকে সরাসরি বলেছেন—
এই মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে।
শেষ আর্তনাদ
চোখ ভরা জল, ক্লান্ত নিথর দেহ নিয়ে নিশানের স্ত্রী আবারও একবারও পেছনে না তাকিয়ে জেল হাজতে ফিরে গেছেন।
জরায়ু সংক্রমণে ভুগছেন তিনি। ডাক্তার জানিয়েছেন—সন্তান ধারণের সম্ভাবনা প্রায় ৮০% নেই।
শেষমেশ নিশান লেখেন—
“এই দেশের যদি কোনো বিবেক থাকে,
তাহলে একদিন আপনারাই এর বিচার করবেন।
এই জুলুমের বিচার আল্লাহ নিজেই করবেন।

আবির হোসেন সান/এমটিভি বাংলা
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৫:১৮ অপরাহ্ণ