চট্টগ্রামের রাউজানে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ১৫ মাসে ২১ খুন, গুলিবিদ্ধ ৩৫০+

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬ । ১২:৪৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘর্ষে গত ১৫ মাসে অন্তত ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ১৫ জন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এদের অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ড সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৩৫০ জনের বেশি, যা সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একক কোনো উপজেলায় রাজনৈতিক সহিংসতার সর্বোচ্চ ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংঘর্ষের কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা—বর্তমান সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং উত্তর জেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতা গোলাম আকবর খোন্দকার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এলাকায় দলীয় কর্মকাণ্ড জোরদার হলে দুই গ্রুপের পুরোনো বিরোধ প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয় বলে দাবি স্থানীয়দের।

প্রতিটি ইউনিয়ন, বাজার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র এখন দুই পক্ষের প্রভাব বলয়ের মধ্যে বিভক্ত। এলাকাবাসীর ভাষায়, রাউজান বর্তমানে সহিংসতাপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

টার্গেট কিলিংয়ের নতুন কৌশল

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ড একই কৌশলে সংঘটিত হয়েছে। দুই বা তিনজন মুখোশধারী ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিত করে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। পুলিশ একে পরিকল্পিত ‘হিট সিস্টেম’ হিসেবে দেখছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলাকারীদের কাছে ভেতরের তথ্য থাকে—কে কখন কোথায় থাকেন, কার সঙ্গে দেখা করেন—এসব আগে থেকেই জেনে তারা হামলা চালায়। কয়েকটি হত্যাকাণ্ড পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে ঘটলেও এখনো মূল হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা যায়নি।

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড

সর্বশেষ বুধবার রাতে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়া হাটবাজারে যুবদল নেতা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ (৫০) গুলিতে নিহত হন। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মুখোশধারী কয়েকজন মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্র অবস্থিত।

নিহতের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বলেন, “এর আগেও আমার স্বামীকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। সেবার বেঁচে গেলেও এবার আর রক্ষা পাননি। আমরা জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।”

এর আগে ৫ জানুয়ারি একই কায়দায় যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৫ অক্টোবর রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে যুবদল কর্মী আলমগীর আলম এবং ৭ অক্টোবর ব্যবসায়ী ও বিএনপি কর্মী আবদুল হাকিম গুলিতে নিহত হন।

অস্ত্রের বিস্তার ও প্রশাসনের ভূমিকা

স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার বেড়েছে। দুই গ্রুপই অস্ত্র সংগ্রহ ও সশস্ত্র টিম গঠনে সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বলেন, “প্রতিটি ঘটনায় আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অনেক সময় অপরাধীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।”

অন্যদিকে, দুই পক্ষের নেতারাই প্রশাসনের কঠোর ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য—হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

উদ্বেগে স্থানীয়রা

ক্রমবর্ধমান সহিংসতায় আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনায় সামাজিক স্থিতিশীলতা ও স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অনেকে।

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন