জনবল সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল

মো: নুরজামাল, ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬ । ৪:২৯ অপরাহ্ণ

শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল এখন যেন এক সংকটের নাম। দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতার কারণে জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালটিতে দিন দিন ভেঙে পড়ছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। এতে একদিকে যেমন দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা, অন্যদিকে চরম মানসিক চাপ ও আতঙ্কে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসকরা। ফলে হাসপাতালটিকে ঘিরে বাড়ছে চিকিৎসক-রোগীর দ্বন্দ্ব, তৈরি হচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি।

১০০ শয্যার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৭২টি। অথচ বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৮ জন চিকিৎসক। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। এতে করে প্রতিদিন শত শত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে কার্যত হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, মেডিসিন, শিশু ও গাইনি বিভাগে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে হাসপাতালের ভয়াবহ বাস্তবতা। গত ১৫ মে ২০২৬ (শুক্রবার) রাতে রোগীর স্বজন ও বহিরাগতদের হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করেই একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসকের ওপর হামলা চালায়। এতে হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানো হয়।

এই ঘটনার পর অনেক চিকিৎসকই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিনিয়ত ভয় ও চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাদের। রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং লোকবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব না হলেও ক্ষোভের শিকার হতে হচ্ছে চিকিৎসকদেরই।

হাসপাতালের এক দায়িত্বরত চিকিৎসক বলেন,
“প্রতিদিন রোগীর চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি। কিন্তু অনেক সময় পুরো বিভাগ সামলাতে একজন চিকিৎসককেই ডিউটি করতে হয়। এতে রোগীদের অপেক্ষা বাড়ে, সেবায় বিলম্ব হয়, আর এসব নিয়েই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।”

আরেক নারী চিকিৎসক বলেন,
“একজন চিকিৎসককে একই সময়ে একাধিক ওয়ার্ড ও জরুরি রোগী সামলাতে হয়। ফলে কোথাও না কোথাও সেবার ঘাটতি থেকেই যায়। এই সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারায় ভুল বোঝাবুঝি বাড়ছে।”

নার্সরাও হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন,
“একেক সময় একজন নার্সকে ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী সামলাতে হয়। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রোগীদের সময়মতো সেবা দিতে গিয়ে আমাদেরও হিমশিম খেতে হয়।”

আরেক নার্স বলেন,
“রোগীর স্বজনরা অনেক সময় পরিস্থিতি না বুঝে নার্স ও চিকিৎসকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না হলে হাসপাতালে কাজের পরিবেশ আরও খারাপ হয়ে যাবে।”

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। সদর উপজেলার বাসিন্দা আয়েশা বেগম বলেন,
“সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ডাক্তার দেখাতে অনেক সময় লাগে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে যেতে হয়। গরিব মানুষের জন্য এটা অনেক কষ্টের।”

এক শিশু রোগীর স্বজন মাহবুব হোসেন বলেন,
“রোগী বেশি আর ডাক্তার কম হওয়ায় সবাই ঠিকমতো সেবা পাচ্ছে না। জরুরি বিভাগে গেলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু জনবল সংকট নয়, হাসপাতালটিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামও নেই। অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালের ভেতরে করা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।

এছাড়া দীর্ঘ পাঁচ বছরেও নতুন হাসপাতাল ভবনের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু না হওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের এমন পরিস্থিতি জেলার স্বাস্থ্যখাতের সার্বিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে। তাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্যখাতে কার্যকর পরিকল্পনা ও নজরদারির অভাব রয়েছে। ফলে জেলার লাখো মানুষ মানসম্মত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম বলেন,
“সরকারি হাসপাতালে সেবা না পাওয়ার কারণেই মানুষ এখন বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছে। অথচ সবার পক্ষে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়।”

আরেক বাসিন্দা এম টিভি বাংলাকে জানান,
“চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে হবে। না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রেহান উদ্দিন বলেন,
“হাসপাতালে জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা জরুরি। তত্ত্বাবধায়কসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি।”

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

জেলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে সরকার। অন্যথায় চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে জেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন