শরীয়তপুর সদর উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের উত্তর রায়পুর গ্রামে চুরির অপবাদ, মারধর ও সামাজিক লাঞ্ছনার ঘটনায় এক তরুণ শিক্ষকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। নিহত শিক্ষক সজিব মোল্লা (২৭)-এর পরিবারের অভিযোগ, মিথ্যা চুরির অভিযোগে প্রকাশ্যে অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। পরে বিষপান করলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ মে রাতে গঙ্গাপ্রসাদ এলাকায় সজিব মোল্লাকে ডেকে নিয়ে চুরির অভিযোগে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় এমদাদ মাদবরের ছেলে এলেম মাদবর (৩৮), সজল মাদবর (৩২) ও সেলিম মাদবর (৪০)-সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
নিহতের পরিবার জানায়, ঘটনাটির সূত্রপাত একটি স্বর্ণের কানের দুল বিক্রিকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় দুই কিশোর জোনায়েদ মাদবর (১৪) ও লাবিব ফরাজী (১৪) নদীর পাড়ে একটি স্বর্ণের কানের দুল পেয়ে তা বিক্রির উদ্দেশ্যে মাদারীপুরে যায়। কোনো স্বর্ণ ব্যবসায়ী দুলটি কিনতে রাজি না হওয়ায় তারা তাদের শিক্ষক সজিব মোল্লার সহায়তা নেয়। শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি তাদের সঙ্গে গিয়ে দুলটি বিক্রয়ে সহযোগিতা করেন। পরে দুলটি প্রায় ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে পরবর্তীতে দুলটিকে চুরিকৃত মালামাল দাবি করে সজিব মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় এবং তাকে মারধর করা হয় বলে পরিবারের দাবি।
নিহতের বাবা হান্নান মোল্লা বলেন, “আমার ছেলে নির্দোষ ছিল। সে শুধু দুই ছাত্রকে সহযোগিতা করেছিল। অথচ তাকে চোর অপবাদ দিয়ে মারধর করা হয়েছে। অপমান সহ্য করতে না পেরে সে বিষপান করে। আমি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সজিবের মা বলেন, “আমার ছেলেকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মারধর করা হয়েছে। অপমানের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সে চলে গেছে। আমি এর বিচার চাই।”
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মে সন্ধ্যায় সজিব মোল্লা বিষপান করেন। পরে তাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।
সজিব মোল্লার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সোমবার তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিচারের দাবি জানান।
রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “সজিব মোল্লা অত্যন্ত ভদ্র ও দায়িত্বশীল একজন শিক্ষক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের পরিণতিতে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
অভিযোগে নাম উল্লেখ থাকা এলেম মাদবর, সজল মাদবর ও সেলিম মাদবরের বাড়িতে গিয়ে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
পালং মডেল থানার আওতাধীন সন্তোষপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হাবিব বলেন, “এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি থানায় নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
এদিকে সজিব মোল্লার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তর রায়পুর গ্রামে শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা বলছেন, একজন শিক্ষকের এমন করুণ পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, চুরির অভিযোগ, মারধর এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার বিষয়গুলো বর্তমানে তদন্তাধীন। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে এলাকাবাসী।

মো: নুরজামাল এমটিভি বাংলা প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬ । ৮:৪৬ অপরাহ্ণ