হাদি হত্যা মামলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সিআইডি

সাজিদ বিন বশির, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার, ঢাকা
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬ । ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

* শহীদ শরিফ ওসমান হাদীকে কাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছিল, সব জানেন বলে দাবি মমতার
* মমতার এই বক্তব্যসহ সব তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সিআইডি
* বাংলাদেশ সরকার মমতার ওই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছে
* বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতে, বিষয়টি ভারতের রাজনৈতিক খেলা

 

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন, তা তদন্তের অংশ হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটির মতে, মামলার তদন্তে সহায়ক হতে পারে—এমন যেকোনো তথ্য, বক্তব্য বা সূত্রই যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হবে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি মন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের একাংশ এটিকে ভারতের রাজনৈতিক কৌশল বা প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

শরিফ ওসমান হাদি হত্যার পর থেকেই ইনকিলাব মঞ্চ দাবি করে আসছে যে ঘটনাটির সঙ্গে ভারতের কোনো না কোনো পর্যায়ের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর সেই দাবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংগঠনটির নেতারা বলছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের শনাক্তকরণ, বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এসব দাবিতে সংগঠনটি নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কিছুদিন পর কলকাতার ধর্মতলা এলাকায় এক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা তাঁকে বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছিলেন। মমতা ইঙ্গিত দেন যে তিনি পুরো ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে অবগত, তবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তিনি বিস্তারিত প্রকাশ করতে চান না।
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশে মামলাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

মামলাটির তদন্ত বর্তমানে সিআইডির হাতে রয়েছে। সংস্থাটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে কোনো তথ্যকে আগে থেকেই গ্রহণ বা বাতিল করা হচ্ছে না। বরং সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
সিআইডির মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

হাদি হত্যা মামলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আসামি বর্তমানে ভারতে আটক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেন। এছাড়া ফিলিপ সাংমা নামের আরেকজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে আসামিদের সীমান্ত অতিক্রমে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, এসব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আইনি ও কূটনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য মূলত ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকার মনে করে, এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনার জন্য সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং এ বিষয়ে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে।

বিরোধী রাজনৈতিক মহলের নেতারা মমতার বক্তব্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে, বক্তব্যে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করা হলেও এটি ইঙ্গিত দেয় যে ঘটনাটিকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করতে পারে।
তাদের দাবি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিবেশী দেশের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে আলোচনা রয়েছে, এই বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।

এদিকে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মামলার বাদী নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন। হাদির বোন মাসুমা হাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্টে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তিনি দাবি করেন, ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তিনি হাসপাতালেই ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের কাউকে বাদী না করে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরকে কেন মামলার বাদী করা হলো—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

মাসুমা হাদির মতে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তাঁদের পরিবার বিভিন্ন ধরনের চাপ ও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবে এতদিন পরিবারের স্বার্থে তিনি বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আনেননি। সাম্প্রতিক বিতর্কের পর তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা অবস্থায় শরিফ ওসমান হাদির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। মোটরসাইকেলে আসা হামলাকারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।

প্রাথমিক তদন্ত শেষে গোয়েন্দা পুলিশ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। কিন্তু মামলার বাদীপক্ষ সেই তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করলে আদালত পুনরায় অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন এবং দায়িত্ব সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে একাধিক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তদন্তকারীরা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শরিফ ওসমান হাদি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেন। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন।

তাঁর হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে মামলার তদন্ত, বিচার এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জনমনে এখনো ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল বিদ্যমান।

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন