সমুদ্র ডাকে, ফিরছে লাশ: কক্সবাজারে ১২ বছরে ৭৪ মৃত্যু

আহনাফ হামিম
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬ । ৩:৫৭ অপরাহ্ণ

নিরাপত্তাহীন সমুদ্রস্নান, পর্যটকের জীবনের দায় নেবে কে?

নীল সমুদ্র আর সোনালি বালুকাবেলার মোহে প্রতিবছর লাখো মানুষ ছুটে আসেন কক্সবাজারে। আনন্দঘন অবকাশ যাপন, পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত কাটানোর প্রত্যাশা নিয়েই তাদের এই আগমন। কিন্তু সেই আনন্দ ভ্রমণ অনেকের জন্যই পরিণত হচ্ছে বেদনার ঘটনায়। সমুদ্রের স্রোতে ভেসে যাওয়া, নিখোঁজ হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৪ জন পর্যটক। একই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে এক হাজারের বেশি মানুষকে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত দুজন। শুধু ২০২৫ সালেই সৈকতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই প্রাণ গেছে আরও দুজনের।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে যখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রস্নানে নামছেন, তখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কোথায়?

বিপদের মুখে পর্যটক, সতর্কতার অভাব

সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় বিপজ্জনক অঞ্চল চিহ্নিত করতে লাল পতাকা টাঙানো থাকলেও অধিকাংশ পর্যটক এর অর্থ সম্পর্কে জানেন না। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেই নির্বিঘ্নে নেমে পড়ছেন তারা।

সি-গাল পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ সমুদ্রে নামলেও নিরাপত্তা নির্দেশনা প্রায় অনুপস্থিত। কোথাও স্পষ্ট সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড নেই, নেই পর্যাপ্ত লাইফগার্ডের দৃশ্যমান উপস্থিতি।

শরীয়তপুর থেকে আসা পর্যটক জীবন মোল্লা বলেন, “কোন জায়গা নিরাপদ আর কোন জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা বুঝতে পারিনি। কেউ আমাদের জানায়ওনি।”

ঢাকার পর্যটক জ্যোতি রহমানের মতে, হোটেলে ওঠার সময়ও পর্যটকদের নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। নতুনদের জন্য গাইডলাইন থাকলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

‘মৃত্যুফাঁদ’ হয়ে উঠছে সি-গাল পয়েন্ট

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সৈকতকর্মীদের ভাষ্য, সি-গাল পয়েন্টে প্রায় প্রতি বছরই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গত বছরও এখানে একাধিক পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পর্যটকদের সতর্ক করা হলেও অনেকেই নির্দেশনা মানেন না। ফলে স্রোতে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হন।

লাখো পর্যটকের নিরাপত্তায় সীমিত জনবল

সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে সমুদ্রস্নানরত হাজারো পর্যটকের নিরাপত্তায় কাজ করছেন মাত্র কয়েকজন লাইফগার্ড। তাদের অনেকের হাতেই নেই আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম।

লাইফগার্ড কর্মীদের দাবি, বর্তমান জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। স্বাভাবিক সময়েও প্রতিদিন একাধিক উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়।

সিনিয়র লাইফগার্ডদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি জনবল কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তা।

১২০ কিলোমিটার সৈকত, নিরাপত্তা সেবা মাত্র দেড় কিলোমিটারে

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার হলেও কার্যকর লাইফগার্ড সেবা সীমাবদ্ধ রয়েছে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলীর অল্প কিছু অংশে।

বর্তমানে মোট ২৭ জন লাইফগার্ড কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ সৈকতের বিশাল অংশে নেই কোনো উদ্ধারসেবা কিংবা জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা।

আধুনিক সরঞ্জামের ঘাটতি

লাইফগার্ড সংশ্লিষ্টরা জানান, এখনও অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে হয়। জেট স্কি, দ্রুতগতির রেসকিউ বোট কিংবা উন্নত উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে সময়মতো উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাদের মতে, কক্সবাজারের প্রধান সৈকত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শতাধিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড প্রয়োজন।

হোটেলগুলোও কতটা দায়িত্বশীল?

কক্সবাজারে শত শত আবাসিক হোটেল থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পর্যটকদের জন্য সমুদ্রস্নান সংক্রান্ত নিরাপত্তা নির্দেশনা নেই। চেক-ইনের সময় নিরাপত্তা ব্রিফিং কিংবা কক্ষভিত্তিক নির্দেশনাও খুব একটা দেখা যায় না।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রশাসন নয়, হোটেল মালিক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদেরও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

সচেতনতার বিকল্প নেই

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটকরা কক্সবাজারে পৌঁছানোর আগেই তাদের কাছে নিরাপত্তা বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। বাস, ট্রেন, বিমান, হোটেল এবং সৈকতের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।

এছাড়া বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নির্দেশনা, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড এবং সমন্বিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি ছাড়া প্রাণহানি কমানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ কক্সবাজার। অথচ বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে এখনও নিরাপত্তা অবকাঠামোর বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই, নেই আধুনিক উদ্ধার ব্যবস্থা, সচেতনতাও সীমিত।

ফলে প্রতিবছরই আনন্দের ভ্রমণ শেষ হচ্ছে শোকের সংবাদে। এখন প্রশ্ন একটাই, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কবে কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নেবে?

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন