প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে রাতারাতি ইটের রাস্তা, সপ্তাহ না পেরোতেই তুলে নেওয়া হলো সব: দুর্ভোগে এলাকাবাসী

বগুড়া প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬ । ৮:৪৩ অপরাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রীর বগুড়া সফরকে কেন্দ্র করে গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকায় মাত্র এক রাতের প্রস্তুতিতে কাঁচা সড়কে ইট বিছানো হয়েছিল। তবে সফর শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সেই ইট তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে বৃষ্টির মৌসুমে আবারও কাদাময় সড়কে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি জিয়াবাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য গত অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। দরপত্র শেষে গত বছরের আগস্টে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

এরই মধ্যে গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে এসে বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম এবং চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন করেন। পরে তিনি তাঁর পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ি পরিদর্শনে যান।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে কাঁচা সড়কটি দ্রুত চলাচলযোগ্য করতে রাতারাতি সেখানে ইট বিছানোর উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। স্থানীয়ভাবে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমানকে। সফরের আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে ইট সোলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়, যাতে প্রধানমন্ত্রী ওই পথ ব্যবহার করে পৈতৃক বাড়িতে যেতে পারেন।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী সফর শেষ করে ফিরে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সড়কের পুরো ৫০০ মিটার অংশ থেকে ইট তুলে নেওয়া হয়। এতে এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর আগমনের সময় রাস্তা ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় আমরা ভেবেছিলাম দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে। কিন্তু ইট তুলে নেওয়ার পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এখন বৃষ্টির দিনে চলাচল করা খুবই কষ্টকর।”

এ বিষয়ে আতিকুর রহমান জানান, এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী অস্থায়ীভাবে ভাটা থেকে ইট এনে রাস্তার ওপর বিছানো হয়েছিল। সফর শেষে একই ইট আবার খুলে ভাটায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এলজিইডি শুধু পরিবহন ও শ্রমিক খরচ দিয়েছে। তবে মোট কত টাকা পেয়েছি, তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।”

গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, “সড়কটি পাকাকরণের জন্য ইতোমধ্যে ৮৪ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে এবং ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সড়কের সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। বর্তমানে রাস্তার পাশে প্যালাসাইডিংয়ের কাজ চলছে।”

তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের কারণে অস্থায়ীভাবে সড়কে ইট বিছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ৫০০ মিটার মূল সড়কের পাশাপাশি আরও ১৫০ মিটার রাস্তা ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫০ মিটার রাস্তা নির্মাণ ও অন্যান্য কাজের জন্য গাবতলী উপজেলা পরিষদ ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বাকি অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

অন্যদিকে, এলজিইডির বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান দাবি করেন, পুরো কাজটি নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, “সড়কটি যেহেতু স্থায়ীভাবে পাকাকরণের জন্য আগে থেকেই বরাদ্দপ্রাপ্ত, তাই অস্থায়ীভাবে ব্যবহৃত ইট পরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইটগুলো ভাড়ায় নেওয়া হয়েছিল। নতুন ইট কিনলে ব্যয় আরও বেড়ে যেত।”

তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক। তিনি বলেন, “কোনো সড়ক পাকাকরণের জন্য দরপত্র ও কার্যাদেশ সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথির সফর উপলক্ষে এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বলেই মনে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর আগমনের আগে তড়িঘড়ি করে রাস্তা ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া এবং সফর শেষ হওয়ার পর তা আবার খুলে নেওয়ার ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ কাজে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে, তার যথার্থতা নিয়েও জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।”

এদিকে স্থানীয়রা দ্রুত সড়কের স্থায়ী উন্নয়নকাজ শুরু করে চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই সড়কটি শুধুমাত্র ভিআইপি সফরের সময় সাময়িকভাবে সংস্কার করা হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখনো দূর হয়নি।

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন