বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ভেঙে নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন এবং সেগুলোর নামকরণকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত গেজেটে নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম প্রকাশের পর বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনায় উঠে আসে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শিবগঞ্জ উপজেলায় ‘মীরবাড়ি’ এবং নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। তবে নতুন ইউনিয়নগুলোর মধ্যে তিনটির নাম স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ‘মীরবাড়ি’ নামটি প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নামের সঙ্গে মিল রয়েছে। একইভাবে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নাম দুটি তাঁর দুই ছেলের নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ফলে ইউনিয়নগুলোর নামকরণে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পাঠানো সুপারিশ ও গণশুনানির ভিত্তিতেই নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
“এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী আমাকে কিছুই বলেননি,” বলেন জেলা প্রশাসক।
কীভাবে এলো নামগুলো?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩ জুন শিবগঞ্জ উপজেলার এক সভায় বিএনপির এক নেতা নতুন ইউনিয়নগুলোর নামকরণের প্রস্তাব দেন। সভায় তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন লিখিতভাবে প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠায়।
এর পর ১১ জুন ‘মীরবাড়ি’ ইউনিয়ন এবং ১৪ জুন ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের গেজেট জারি করা হয়।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান জানান, নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব পাওয়ার পর তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সুপারিশ জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। তবে নামগুলো কারা প্রস্তাব করেছিলেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নাম তাঁর মনে নেই বলে জানান তিনি।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্য
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশ নামকরণ নিয়ে আপত্তির পরিবর্তে সমর্থনই জানিয়েছেন।
শিবগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সভাপতি খালিদ হাসান আরমান বলেন, “প্রতিমন্ত্রীর ছেলে কিংবা বাড়ির নামে ইউনিয়নের নাম হওয়ায় এলাকার মানুষ খুশি হয়েছেন। এতে দোষের কিছু নেই, বরং ভালো হয়েছে।”
নতুন ইউনিয়নগুলোর কাঠামো
গেজেট অনুযায়ী, নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার আওতায় সৈয়দপুর ইউনিয়ন ভেঙে সীমান্ত ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। এতে মানকৈর, ভবানীপুর, অভিরামপুর, খেরুয়াপাড়া, কিশোরীপুর, জগন্নাথপুর, আমঝুপি, জীবনপুর, কুকি কালিদাস ও কুকি জগন্নাথপুরসহ মোট ১১টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ১৬ হাজার ২৬৭।
অন্যদিকে দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে দিগন্ত ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। এর অন্তর্ভুক্ত মৌজাগুলো হলো ভরিয়া (ভৈরা), মেঘাখর্দ্দ, আলমপুর, রহবল, সাওয়ালদহ, কৃষ্ণপুর, তালিবপুর ও বোয়ালমারী। ৮টি মৌজা নিয়ে গঠিত ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ১৭ হাজার ৭৫৯।
শিবগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের অংশ নিয়ে মীরবাড়ি ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। এতে ফেনীগ্রাম, সৈয়দপুর, চন্দনপুর, দোপাড়া, তেয়াইল, গোরনা, ধামাহার, বাদলদীঘি, বেতগাড়ী, রামকান্দি, চকগোপাল, ডাবুর, চককানু, হরিপুর ও গোপীনাথপুরসহ ১৫টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ১৮ হাজার ৯২৪।
এ ছাড়া নতুন ইউনিয়ন গঠন ও পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের কারণে বিহার, রায়নগর, বুড়িগঞ্জ, কিচক ও আটমুল ইউনিয়নও পুনর্গঠন করা হয়েছে।
সংসদে বিতর্ক
নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম নিয়ে সোমবার জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিষয়টি উত্থাপন করেন।
তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী তাঁর এলাকার একটি ইউনিয়নের নাম মীরবাড়ি রেখেছেন। তাঁর দুই সন্তান সীমান্ত ও দিগন্তের নামেও দুটি ইউনিয়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যখন পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণের সংস্কৃতি নিরুৎসাহিত করছেন, তখন এমন ঘটনা প্রশ্নের জন্ম দেয়।”
প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
সমালোচনার জবাবে সংসদে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি দাবি করেন, ইউনিয়নগুলোর নাম তাঁর সন্তানদের নামে রাখা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সৈয়দপুর ইউনিয়নের একটি অংশ গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় নতুন ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘সীমান্ত’। অন্যদিকে গাইবান্ধা জেলার সীমানা সংলগ্ন ও অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী এলাকা হওয়ায় ‘দিগন্ত’ নামকরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “অলৌকিকভাবে আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে ইউনিয়নের নাম মিলে গেছে। কিন্তু আমার সন্তানদের নাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত। যদি ব্যক্তিগতভাবে নামকরণের ইচ্ছা থাকত, তাহলে ‘মীর সীমান্ত’ বা ‘মীর দিগন্ত’ নাম রাখার জন্য বলতাম।”
এ সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁর বক্তব্যের সমর্থন জানান।
বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, “তাহলে কি সীমান্ত ব্যাংকও আমার? কিংবা সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনও আমার? গুলশানের দিগন্ত টাওয়ারও কি আমার?”
আইনে কী বলা আছে?
ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক সরকারি গেজেটের মাধ্যমে কয়েকটি গ্রাম বা সংলগ্ন মৌজার সমন্বয়ে ওয়ার্ড এবং ৯টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে ইউনিয়ন ঘোষণা করতে পারেন। নবগঠিত ইউনিয়নের নাম নির্ধারণের ক্ষমতাও জেলা প্রশাসকের হাতে ন্যস্ত।
তবে আইনে কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ না করার বিধান রয়েছে। সেই কারণে নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যদিও প্রশাসনের দাবি, নামগুলো স্থানীয় সুপারিশ ও গণশুনানির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিবারের নামের সঙ্গে মিল
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, মীর শাহে আলম ১২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। এর মধ্যে রয়েছে ‘মীর সীমান্ত ফিলিং স্টেশন’ এবং ‘মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি’।
প্রতিমন্ত্রীর বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত লন্ডনে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে রাজনীতি ও পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক। ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
এদিকে গত ৮ জুন শাকরুল আলম সীমান্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হলেও পরদিনই পদত্যাগ করেন।
সব মিলিয়ে, নতুন ইউনিয়নগুলোর নামকরণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের ফল, তা নিয়ে বিতর্ক এখনও থামেনি। স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনা এখন জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পৌঁছেছে, আর এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘মীরবাড়ি’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নামের তিনটি নতুন ইউনিয়ন।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬ । ২:৩১ অপরাহ্ণ