আজ ২১ জুন, বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি পালিত হচ্ছে বাবাদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার উদযাপিত এই বিশেষ দিনটি সন্তানের জীবনে বাবার অবদান, ত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে স্মরণ করার এক অনন্য উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে গভীর অনুভূতির শব্দগুলোর একটি ‘বাবা’। এই একটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিরাপত্তা, নির্ভরতা, সাহস, ভালোবাসা এবং অগাধ বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম নায়ক এবং জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যান তিনি।
বাবা দিবসের সূচনা মূলত পশ্চিমা বিশ্বে হলেও বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি দিবসে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্ট এলাকার একটি গির্জায় প্রথমবারের মতো বাবা দিবস পালন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯০৯ সালে মাদার্স ডে উদযাপন দেখে ওয়াশিংটনের বাসিন্দা সনোরা স্মার্ট ডড উপলব্ধি করেন, মায়ের মতো বাবার অবদানও সমানভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। তার উদ্যোগেই ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস উদযাপিত হয়। ধীরে ধীরে দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ এ দিবস পালনের প্রতি সমর্থন জানান এবং ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে জাতীয়ভাবে বাবা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
একজন বাবা পরিবারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তার দায়িত্ববোধ, সততা ও নৈতিক দিকনির্দেশনা সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্তানদের সৎ, আদর্শ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বাবার অবদান অপরিসীম। বাবার সৎ উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত বাসস্থান, সঞ্চয় ও অন্যান্য সম্পদ পরিবারের জীবনযাত্রাকে সহজ ও নিরাপদ করে তোলে, যা সন্তানদের শিক্ষার প্রতি আরও মনোযোগী হতে সহায়তা করে।
মায়ের ভালোবাসা যেমন প্রকাশ্য, বাবার ভালোবাসা অনেক সময় তেমনি নীরব। নিজের চাওয়া-পাওয়াকে আড়াল করে পরিবারের সুখ, শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান তিনি। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করলেও সেই ত্যাগের গল্প অধিকাংশ সময়ই অজানাই থেকে যায়। অনেক সন্তানের সাফল্যের পেছনে বাবার নীরব ত্যাগ, অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন ভালোবাসাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রেরণা। আবেগের চেয়ে দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিলেও সন্তানের প্রতি তার মমত্ববোধ ও স্নেহ পরিবারের ভিত্তিকে দৃঢ় করে রাখে।
বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা, বিশেষ কর্মসূচি ও নানা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি এবং পারস্পরিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও বাবার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, একটি ফোনকল কিংবা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার কয়েকটি আন্তরিক শব্দই একজন বাবার জন্য হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।
কারণ, একজন বাবা শুধু পরিবারের অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের স্বপ্নের কারিগর, সাহসের উৎস এবং জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে নির্ভরতার আরেক নাম।
তাই বিশ্ব বাবা দিবসের মূল বার্তাই যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— “বাবা, তুমি আছ বলেই পৃথিবীটা এত নিরাপদ, এত সুন্দর।”

মো: নুরজামাল এম টিভি বাংলা প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬ । ১১:২২ পূর্বাহ্ণ