নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ?

শিহাবুল ইসলাম শাহেদ - নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬ । ১:০৪ অপরাহ্ণ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতে গিয়ে আবারও এক নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত কয়েক বছরে একই ধরনের একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পরও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ১০ তলা ইউটিলিটি ভবন-৪-এ স্যানিটারি কাজ করার সময় ওপর থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন নির্মাণশ্রমিক রাসেল। সহকর্মীরা তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিহত রাসেলের বাড়ি চাঁদপুর জেলায়।

এর আগে ২০২৫ সালের ২২ মার্চ নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবন থেকে পড়ে মারা যান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নির্মাণশ্রমিক মো. ইব্রাহিম। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোজা অবস্থায় কাজ শেষে নিচে নামার সময় ভবনের ফাঁকা অংশের পাশে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে নিচে পড়ে যান তিনি। পরে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই সময় শ্রমিকরা অভিযোগ করেছিলেন, বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করেনি।

এছাড়া ২০১৯ সালের ১৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্র হলের নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনের অষ্টম তলা থেকে পড়ে মারা যান ২০ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক হাসান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনাতেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।

শুধু প্রাণহানিই নয়, ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই নির্মাণাধীন একটি ছাত্র হলের বারান্দার ছাদ ধসে অন্তত ১০ জন নির্মাণশ্রমিক আহত হন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, ঢালাইয়ের সময় দুর্বল সাপোর্ট ব্যবহারের কারণেই ছাদ ধসে পড়ে। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনার পর প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও নির্মাণশ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের বাধ্যতামূলক ব্যবহার এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) ও বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের জন্য হেলমেট, সেফটি বুট, গ্লাভস, গগলস, মাস্ক এবং দুই মিটারের বেশি উচ্চতায় কাজের ক্ষেত্রে সেফটি বেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এছাড়া নিরাপদ মাচা নির্মাণ, উন্মুক্ত স্থান ও লিফটের পাশে নিরাপত্তা রেলিং ও সেফটি নেট স্থাপন এবং দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করারও বিধান রয়েছে।

সাম্প্রতিক শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় নির্মাণাধীন ইউটিলিটি ভবন-৪-এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান খান অ্যান্ড সন্স বিডি লিমিটেড-এর প্রকৌশলী জসিম বলেন, নিহত শ্রমিক ও তার সহকারীকে সেফটি বেল্ট দেওয়া হয়েছিল। তবে নিহত শ্রমিক নিজে সেফটি বেল্ট ব্যবহার করেননি এবং তার সহকারীকে বলেছিলেন, বেল্ট না পরলেও সমস্যা হবে না।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলামকে দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলাম বলেন, প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তারা নিয়মিত নির্মাণকাজ তদারকি করেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরাও নিজেরা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, দেশে প্রচলিত বিমা নীতিমালা অনুযায়ী মৃত্যুর ঘটনায় এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকলেও এটি কোনোভাবেই একটি পরিবারের ক্ষতির সমাধান নয়। তাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই নিহত শ্রমিকের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব নিতে হবে এবং এ বিষয়ে তাদের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে।

সম্পাদক: সোহেল আহম্মেদ নির্বাহী সম্পাদক: মোস্তফা কামাল সুমন কপিরাইট © এম টিভি বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন