পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও পঞ্চগড়-২ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভাইরাল ছবি ও ভিডিওকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং জেলা বিএনপির নেতারা শুরু থেকেই এগুলোকে ‘এআই-নির্মিত ভুয়া ছবি ও ভিডিও’ বলে দাবি করে আসছেন। তবে ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট তাদের প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার কোনো প্রমাণ তারা পায়নি।
বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্য ডিসেন্ট জানায়, পঞ্চগড় ও ঢাকার একাধিক সাংবাদিকের কাছ থেকে তারা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এক নারীর ২০ সেকেন্ডের একটি শব্দহীন ভিডিও, পাঁচটি স্থিরচিত্র এবং হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে যাচাই করেছে। তাদের দাবি, সংগৃহীত ভিডিও ও ছবিগুলোর রেজুলেশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সংস্করণের তুলনায় উন্নত ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংগৃহীত সব ছবি ও ভিডিও একাধিক এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুলে পরীক্ষা করা হলেও কোথাও এগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট থেকে নারীর পরিচয় অনুসন্ধান
দ্য ডিসেন্ট জানায়, হোয়াটসঅ্যাপের একটি স্ক্রিনশটে শাড়ি পরা এক নারীর ছবি এবং একটি বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর দেখা যায়। ওই নম্বরটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা যায়, সেটির বিকাশ পারসোনাল অ্যাকাউন্ট এক অমুসলিম নারীর নামে নিবন্ধিত।
পরে ওই নারীর বিষয়ে অনুসন্ধান করে সংবাদমাধ্যমটি দাবি করে, তার বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের সেই গ্রামেই, যেখানে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের বাড়ি। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই নারীর জন্ম ১৯৯৫ সালের জুন মাসে।
দ্য ডিসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের পর এক নারী ফোন রিসিভ করেন এবং নিজের পরিচয় দেন, যা বিকাশ অ্যাকাউন্টের তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়।
নিজের ছবি শনাক্ত করলেন নারী
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাইরাল হওয়া হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশটে থাকা শাড়ি পরা ছবিটি যাচাইয়ের জন্য ওই নারীর অনুমতি নিয়ে তার কাছে পাঠানো হলে তিনি ছবিটি নিজের বলে স্বীকার করেন। তবে তার ভাষ্য, ওই ছবি কীভাবে সেখানে এসেছে, তা তিনি জানেন না।
একই সঙ্গে ভাইরাল হওয়া ছবি, ভিডিও কিংবা স্ক্রিনশট সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলেও দাবি করেন।
প্রতিমন্ত্রীকে চেনেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “একজন এমপিকে চিনবো না কেন।”
নিজের পরিচয় সম্পর্কে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি পড়াশোনা করছেন এবং চাকরি খুঁজছেন। তবে বাসার ঠিকানা জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
প্রতিবেশীদের দাবি
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার বরাতে বলা হয়, ওই নারীর বাবা মারা গেছেন। বর্তমানে তার মা ও এক ভাই রয়েছেন। ভাই এলাকায় অটোরিকশা চালানোর পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন।
একজন অমুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, যিনি ওই নারীকে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করেন, দাবি করেন যে ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর ওই নারীর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ফরহাদ হোসেন আজাদ। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার পর প্রতিমন্ত্রীর ফোন
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৮ জুলাই রাত ৯টা ৩০ মিনিট থেকে ৯টা ৩২ মিনিট এবং পরে রাত ৯টা ৪৪ মিনিট থেকে ৯টা ৪৯ মিনিট পর্যন্ত দুই দফায় ওই নারীর সঙ্গে তাদের প্রতিবেদকের কথা হয়।
এর ১৩ মিনিট পর রাত ১০টা ২ মিনিটে প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে ০১৭০৭ সিরিজের একটি বাংলাদেশি নম্বর থেকে কল আসে, যেখানে নাম প্রদর্শিত হয় “FORHAD HOSSAIN AZAD”।
প্রতিবেদনের দাবি, প্রতিবেদকের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর আগে কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ ছিল না এবং বিষয়টি নিয়ে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলার আগে অন্য কারও সঙ্গেও আলোচনা করা হয়নি।
পরদিন সকালে ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে প্রথমে কল রিসিভ হয়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানোর পর সেখান থেকে কল আসে।
প্রতিবেদকের প্রশ্ন ছিল, এটি কি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের নম্বর?
জবাবে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। আগের রাতের কলের প্রসঙ্গ তুললে তিনি বলেন, “আসেন, আমার দপ্তরে আসেন, চা খাই।”
পরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি “ব্যস্ত আছি” বলে কল কেটে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য ডিসেন্ট আরও দাবি করেছে, বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোন নম্বরের তালিকায় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের নামে ওই নম্বরটি উল্লেখ রয়েছে।
নম্বর দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার
বুধবার দুপুরে আবারও ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয়, আগের রাতে তার সঙ্গে কথা বলার ১৩ মিনিটের মধ্যে প্রতিমন্ত্রী ফোন করেছিলেন। নম্বরটি তিনি দিয়েছেন কি না।
জবাবে তিনি বলেন, “না না ভাইয়া, আমি কেন নম্বর দিতে যাব। আর আমার একটা ছবি বা নম্বর কোথাও পাওয়া গেলে এই যুগে এত চিন্তিত হওয়ার তো কিছু নাই। আমি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত।”
মোবাইল কভার নিয়েও পর্যবেক্ষণ
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোর একটিতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় মোবাইল ফোনে সেলফি তুলতে দেখা যায়। সেখানে ব্যবহৃত মোবাইলের কভারের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবহৃত মোবাইল কভারের মিল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে তার ফেসবুক প্রোফাইলে থাকা কিছু ছবিরও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পৃথক কোনো ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর থেকেই প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং জেলা বিএনপির নেতারা ধারাবাহিকভাবে এগুলোকে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট বলে দাবি করে আসছেন। অন্যদিকে, দ্য ডিসেন্ট তাদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বলেছে, তারা এআই ব্যবহারের কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬ । ১০:৫৮ অপরাহ্ণ