ফেনীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে আদালতে রায় পড়া শুরু হয়।
যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল
হাইকোর্ট যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন তারা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
চারজনের সাজা কমে যাবজ্জীবন
মৃত্যুদণ্ড থেকে সাজা কমিয়ে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন সাইফুর রহমান জুবায়ের, উম্মে সুলতানা পপি, নুর উদ্দীন ও সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ।
খালাস ১০ আসামি
হাইকোর্টের রায়ে খালাস পেয়েছেন মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, মহিউদ্দিন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম।
আদালতে আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান ও ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।
যেভাবে নুসরাতকে হত্যা করা হয়
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরীন আখতার। পরে পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে।
অধ্যক্ষকে কারাগার থেকে মুক্ত করার চেষ্টা এবং নুসরাতকে মামলা প্রত্যাহারে চাপ দেওয়ার জন্য তার অনুসারীরা তৎপরতা চালায়। ৩ এপ্রিল কারাগারে গিয়ে কয়েকজন আসামি সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরদিন ৪ এপ্রিল মাদরাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে নুসরাতকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় এনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।
এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান মামলা করেন। ২৮ মে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরে ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
৬১ কার্যদিবসে বিচার শেষ
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
ওই বছরের ২৯ অক্টোবর ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার হাইকোর্টে মামলাটির রায় ঘোষণা করা হলো।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ । ১:৫৬ অপরাহ্ণ