১৪৫৭ কোটি টাকার খুরুশকুল মডেল টাউন: লটারির মাধ্যমে নতুন স্বপ্নের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা পেল ৭৩০ পরিবার
জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম আঘাত আর বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কারণে ভিটেমাটি হারানো কক্সবাজারের সমিতিপাড়ার হাজারও মানুষের জন্য এসেছে বহু প্রতীক্ষিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জীর্ণ ও স্যাঁতসেঁতে ঝুপড়িঘর ছেড়ে তাদের এবার উঠতে হচ্ছে আধুনিক বহুতল ভবনের সুসজ্জিত ফ্ল্যাটে। গতকাল রোববার (২ আগস্ট) কক্সবাজারের খুরুশকুলে জেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় এবং সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে এক স্বচ্ছ ও আনন্দঘন পরিবেশে ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারি অনুষ্ঠিত হয়। এ লটারির মাধ্যমেই ৭৩০টি জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য সুনির্দিষ্ট ভবন ও ফ্ল্যাট নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বহু বছরের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নিজেদের একটি নিরাপদ ঠিকানার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌছে গেছে শত শত পরিবার।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও মানবিক এ আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রমতে, পুরো প্রকল্পে মোট ৪ হাজার ১২৮টি বাস্তুচ্যুত পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১২৯টি দৃষ্টিনন্দন পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যার প্রতিটিতে রয়েছে ৩২টি করে আধুনিক ফ্ল্যাট। ইতোমধ্যেই ১২২টি ভবনের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে এবং বাকি ৭টির কাজও শেষের পথে। এর আগে প্রথম ধাপে ১৯টি ভবনে ৬০০টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, খুরুশকুল আবাসন প্রকল্পকে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বিশ্বমানের পরিবেশবান্ধব মডেল টাউন হিসেবে। বাকখালী নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে এখানে বর্জ্য শোধনাগার (STP), ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি ভবনে সোলার প্যানেল, রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ব্যবস্থা এবং নিচতলায় দুর্যোগকালীন আশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া বাসিন্দাদের সুবিধার্থে মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার, মার্কেট কমপ্লেক্স, চারটি সাইক্লোন শেল্টার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বাকখালী নদীর তীরে দুটি জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, শতভাগ গুণগত মান বজায় রেখে বস্তিতে বসবাসকারী মানুষকে একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের জীবন উপহার দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান নিশ্চিত করেছেন যে, শুরু থেকেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে সবার সামনে শতভাগ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় লটারি সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান এলাকাটিকে অপরাধ ও মাদকমুক্ত রাখতে নিয়মিত টহল ও কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মশিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ লটারির মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত এই মানুষগুলো কেবল এক টুকরো ছাদই পাননি, বরং খুঁজে পেয়েছেন সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার এক নতুন আশ্বাস।


আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]