ফুলবাড়ী বিএনপির কমিটিতে ৬ সরকারি চাকরিজীবী, আহ্বায়ক-সদস্য সচিব দুজনই প্রধান শিক্ষক
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির ২০ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে সরকারি স্কুল-কলেজ ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ছয় চাকরিজীবীর থাকার অভিযোগ উঠেছে। কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব, দুই শীর্ষ পদেই রয়েছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সরকারি চাকরিবিধিতে রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ গ্রহণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বিধিনিষেধ থাকায় এ কমিটি নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও সদস্যসচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ যৌথ স্বাক্ষরে ২০ সদস্যের এ কমিটির অনুমোদন দেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুজ্জামান হাসু। আর সদস্যসচিব করা হয়েছে পূর্ব কুরুষা ফিরুষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান মুকুলকে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাঁরা এ পদ পেয়েছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন কবির মামুদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন, যতীন্দ্র নারায়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল, সরকারি সাইফুর রহমান কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক শাহীনুর রহমান এবং অগ্রণী ব্যাংকের ফুলবাড়ী শাখার সিনিয়র কর্মকর্তা তহিদুল হক।
কমিটি নিয়ে পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ
কমিটি ঘোষণার পর ফুলবাড়ীতে পদবঞ্চিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে জেলা নেতাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।
কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, “এ কমিটিকে কোনোভাবেই দলীয় কমিটি বলা যাবে না। এটি মূলত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কমিটি। জেলা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব সম্পূর্ণ অনিয়ম করে তাঁদের কমিটিতে বসিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, পুরো বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ড ও কেন্দ্রীয় নেতাদের লিখিতভাবে জানানো হবে।
চাকরিবিধি নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫(১) বিধি অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ বিধির আলোকে সরকারি চাকরিতে থাকা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলের কমিটিতে পদ গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে কমিটির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হাসু বলেন, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান পদে এবং সদস্যসচিব আব্দুল মান্নান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ কারণে তাঁরা দুজনই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
কমিটির সদস্য ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেনের চাকরির মেয়াদ আর এক বছর রয়েছে বলেও জানান হাসু।
তিনি বলেন, “আমাদের বিপক্ষ পার্টি এসব করছে। আমি ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম, যুবদলের সভাপতি ছিলাম। আওয়ামী লীগ-বিএনপি, কারও আমলে আমার চাকরি যায়নি।”
শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, চাকরিবিধি অনুযায়ী সরকারি শিক্ষক ও কর্মচারীদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া, পদ গ্রহণ, দলীয় সভা-মিছিল কিংবা নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়গুলো বিধিমালার আওতাভুক্ত।
তিনি আরও বলেন, ফুলবাড়ীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক দল বা কমিটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে কমিটি নিয়ে বক্তব্য জানতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও সদস্যসচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।
সরকারি চাকরিতে থাকা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]