নির্বাচন কি তাহলে হচ্ছেই? (জোট, ভোট ও নোটের রাজনীতি; পর্ব–৯) ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী
বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে। তবে এই নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে— তা শতভাগ নিশ্চিত করে বলার কোনো সুযোগ নেই। ইতিমধ্যেই দেখা গিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বিএনপির ২৭ জন, জামায়াতের ০৯ জন, এনসিপির ০২ জন এবং গণধিকার পরিষদের ২৮ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে আপিলের পর কতজনের মনোনয়ন বহাল রাখা হয়, সেটা একটা বিষয়। পরবর্তীতে যাদের মনোনয়ন স্থায়ীভাবে বাতিল হবে, তাদের পক্ষ থেকে যদি কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, নির্বাচনের পথে সেটি একটি প্রতিবন্ধকতা বলেই গণ্য হবে।
প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ছাড়া প্রায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দই সুষ্ঠু নির্বাচন আদৌ হবে কিনা— সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। তাদের সকলেরই দাবি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না— এ কথাটি কেউ বলছেন না। সেজন্যই আমরা বলতে পারি, নির্বাচন ১২ই ফেব্রুয়ারি হবে— তা শতভাগ নিশ্চিত বলার কোনো সুযোগ নেই।
এটা হলো দেশের ভেতরের রাজনৈতিক চাল-চক্রান্তের কথা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সময়ই বিদেশিদের প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপ থাকে; ৫ই আগস্টের পর থেকে যা প্রকট রূপ ধারণ করেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর; কিন্তু কখনোই এ দেশের নির্বাচন ও রাজনীতি বিদেশিদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কারণ বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যভুক্ত একটি দেশ। যে কারণে সব সময়ই ব্রিটেনের ডিপ স্টেট বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। আমার অনুমান যদি ভুল না হয়, তাহলে এ বছরও বাংলাদেশে রাজনৈতিক আবহাওয়ার গতি পরিবর্তনে তাদের হস্তক্ষেপ বিদ্যমান ছিল— তা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত।
পাশাপাশি পৃথিবীর স্বঘোষিত মোড়ল রাষ্ট্রটি তো তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের রাজনীতিতেই হস্তক্ষেপ করে থাকে। আর তাদের যেকোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পেছনে থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য— দরকষাকষি এবং তাদের পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করার এক অলিখিত নীতিমালা। যদি দেখা যায়, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সেটেল গভর্নমেন্ট রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে গিয়েছে, তখন বিদেশিদের— বিশেষ করে পশ্চিমাদের— অবৈধ, অনৈতিক ও দেশবিরোধী চুক্তি এবং স্বার্থ হাসিল করা অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হবে। সেজন্য তাদের পক্ষ থেকেও নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন না হোক— সে ধরনের প্রচেষ্টা থাকতে পারে।
এ জাতির জন্য এটা সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদই রাজনীতির ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতির চর্চা করে এসেছেন। রাজনীতির ময়দানে তারাই এগিয়ে থাকেন, যাদের কাছে Money, Muscle, Media, Mandate— এই চারটি শক্তি বিদ্যমান থাকে। তারাই রাজনৈতিক জোরে এগিয়ে থাকেন। পাশাপাশি রয়েছে দেশের রাজনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার জন্য অসাধু ব্যবসায়ী মহল— যাদের মধ্যে কিছু অলিগার ব্যবসায়ী আছে, যারা সবসময়ই রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের চেষ্টা করে থাকেন।
মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের রাজনীতি কোনো আদর্শের ওপর গড়ে ওঠেনি; বরং তা গড়ে উঠেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দলকেন্দ্রিক রাজনীতির ওপর। যেখানে একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ জাতির প্রত্যাশা থাকার পরেও রাজনীতিবিদরা তা উপহার দিতে পারেননি। সহস্রাধিক মানুষের আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করা গিয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক জঞ্জালগুলো পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।
অতএব, নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও যারা ক্ষমতায় বসবেন, তাদের পক্ষে এ জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা কতটুকু সম্ভব হবে— সে এক বিরাট প্রশ্ন।
যতদিন পর্যন্ত রাজনীতিবিদদের মধ্যে সততা, স্বচ্ছতা এবং সৎ সাহস না থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের পক্ষে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে দেশের পক্ষে, জাতির পক্ষে কাজ করা আদৌ সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে এখন চলছে ট্যাগিংয়ের রাজনীতি। একদল আরেকদলকে নির্দ্বিধায় ট্যাগিং করছে যে, এ দলটি ভারতের সঙ্গে আঁতাত করেছে। আবার কোনো দল কোনো দলকে বলছে, এ দলটি পিন্ডির সঙ্গে আঁতাত করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য— এ দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে কেউ দিল্লির বিরোধিতা করে, কেউ পিন্ডির বিরোধিতা করে; কিন্তু সবকিছুর নেপথ্যে যে দেশটির কালো হাত এ দেশের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অরাজকতার জন্য দায়ী— সে দেশটির (ওয়াশিংটনের) বিরোধিতা কেউ করে না।
অবশ্যই আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রটি আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু জাতীয় রাজনীতি ও বিশ্ব রাজনীতিতে যাদের পড়াশোনা আছে, তারা জানেন— আটলান্টিকের ওপারের কথিত পরাশক্তি দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে কখনো পিন্ডিকে ব্যবহার করে, কখনো দিল্লিকে ব্যবহার করে।
পিন্ডি বাংলাদেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না, আর দিল্লি কখনোই সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সাহস বা ক্ষমতা কোনোটাই রাখে না। মূলত তারা বিগতকালে এ দেশে যত ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে— সবই আটলান্টিকের ওপারের সে দেশটির সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে কাজ করেছে। আর দ্বিতীয়ত, উগ্রবাদী পৌত্তলিকদের হাতে যে দেশটির নিয়ন্ত্রণ, সে দেশের সরকার ও প্রশাসন দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ বাংলাদেশের বিরোধিতা করবে— এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কারণ তারা মুসলমানকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে থাকে।
আমার মনে হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এ দেশের কোনো সরকারই অনুসরণ করেনি; ভবিষ্যতেও করতে পারবে কিনা— সেটারও কোনো গ্যারান্টি নেই। বরং সম্ভাবনাও আছে বলে আমরা মনে করি না। শুধুমাত্র এ দেশে বিশ্বাসী, সৎ ও চরিত্রবান রাজনীতিবিদগণ যদি ইসলামের সুমহান আদর্শকে রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, তখনই সম্ভব হবে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা— যে দেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীন এবং যে দেশের সরকার দিল্লি, পিন্ডি, ওয়াশিংটন কিংবা লন্ডন— কোনো দেশেরই তোয়াক্কা করবে না; বরং স্বাধীনভাবে দেশের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের যোগ্যতা ও সাহস অর্জন করবে।
এ কথাগুলো শোনার মতো ধৈর্য আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের এখন নেই। কারণ প্রত্যেকেই পাওয়ার পলিটিক্সে ব্যস্ত। প্রত্যেকেই আসন ভাগাভাগি এবং নিজ নিজ আসনে কীভাবে বিজয়ী হওয়া যায়— এ বিষয়ে নির্ঘুম কাজ করে যাচ্ছেন। স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের সমস্যার সমাধানে খুব কম রাজনীতিবিদই চিন্তা করে থাকেন।
আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দান করুন এবং সকল প্রকার দেশি-বিদেশি চক্রান্ত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]