আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে? ৮ বছর পর একরাম হত্যার বিচারের দুয়ারে কান্নার অধিকার হারানো পরিবার
আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে?’- মেয়ের এই অবুঝ প্রশ্নে থমকে গিয়েছিল পুরো দেশ। মোবাইল ফোনের ওপারে বাবার শেষ আর্তনাদ শুনেছিল কোটি মানুষ।
মোবাইল ফোনে বাবাকে ওই প্রশ্নটি করেছিল টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পরপর তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর ও তৎকালীন স্থানীয় যুবলীগ নেতা একরামুল হকের বড় মেয়ে তাহিয়া হক। তখন তাহিয়া টেকনাফ ৮ বিজিবি স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত, আর ছোট বোন নাহিয়ান হক পড়ত ষষ্ঠ শ্রেণিতে।
২০১৮ সালের ২৬ মে গভীর রাত। বাবার ফেরার অপেক্ষায় অধীর হয়ে ফোন দিয়েছিল কিশোরী তাহিয়া। ওপাশ থেকে বাবার চেনা কণ্ঠ ভেসে এলেও তাতে ছিল না কোনো স্নেহের স্পর্শ; বরং ছিল মৃত্যুর তীব্র আতঙ্ক। মূলত তৎকালীন র্যাব-৭-এর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন একরাম।
মেয়ের সেই আকুল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আর হয়নি বাবার। মা আয়েশা বেগম শিউরে উঠে মেয়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে দরূদ পড়তে শুরু করেছিলেন। কিন্তু অলৌকিক কিছু ঘটার আগেই স্পিকার চিরে ভেসে এলো আগ্নেয়াস্ত্রের হাড়হিম করা শব্দ—‘ঠাস! ঠাস!’—পরপর দুটি গুলির বিকট গর্জন। এরপর জীবনের আলো নিভে যাওয়ার করুণ গোঙানি। ফোনের এ-প্রান্তে তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন এক নারী—যার ভালোবাসার সংসার নিমিষেই শ্মশান হয়ে গেল।
একরামুল হককে হত্যার আগেই সাজানো হয়েছিল এক কুৎসিত রূপকথা। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নিকটাত্মীয় ও তার মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন টেকনাফের নাজিরপাড়ার মৃত ফজল আহামেদের ছেলে একরামুল হক।
প্রশাসনিক চাপ ও মাদকবিরোধী অভিযানের হাত থেকে মূল অপরাধীকে আড়াল করতে সাধারণ টিনের ঘরে বাস করা জনপ্রতিনিধি একরামের গায়ে জোর করে এঁটে দেওয়া হয়েছিল ‘ইয়াবার গডফাদার’ তকমা। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—গণমাধ্যমের চোখে তাকে আগেভাগেই অপরাধী বানিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা, যাতে মূল সিন্ডিকেট অধরা থেকে যায়।
ভিটেমাটি উচ্ছেদ ও ভয়ংকর নজরদারি
হত্যাকাণ্ডের পর সেই ফোনালাপের অডিও জনসমক্ষে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। তথ্য যেন কোনোভাবেই বাইরে না যায়, সেজন্য একরামের পরিবারকে তড়িঘড়ি করে ভিটেমাটি থেকে এক প্রকার উচ্ছেদ করা হয়। বাধ্য হয়ে টেকনাফ ছেড়ে চট্টগ্রামে গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেন আয়েশা বেগম ও তার দুই মেয়ে।
তবে সেখানেও মেলেনি স্বস্তি। আয়েশা বেগম জানান, তাদের বাসার বাইরে ২৪ ঘণ্টা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত বিশেষ বাহিনীর লোক। সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল মহড়া দিত অচেনা মুখ। এমনকি ঘরে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে হুমকি দেওয়া হতো—‘মেয়েদের নিয়ে বের হবেন না, বেশি নাড়াচাড়া করলে আপনাদেরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’
আইনের দরজাতেও তারা বারবার ধাক্কা খেয়েছেন। টেকনাফ থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। আদালতের আশ্রয় নিতে আইনজীবীদের কাছে গেলেও পরদিনই তাদের চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত সিভিল ড্রেসের লোক। ভয়ার্ত চোখে কেসের ফাইল ফিরিয়ে দিয়ে আইনজীবীরা বলতেন, “আমাকে ক্ষমা করবেন, এই মামলা লড়ার সাহস আমাদের নেই।”
মন খুলে কাঁদার অধিকারটুকুও ছিল না
সেদিন মন খুলে কাঁদার অধিকারটুকুও পাননি একরামের স্ত্রী ও এতিম দুই মেয়ে। আয়েশা বেগমের অভিযোগ, তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ফোন করে সংবাদমাধ্যম বা মানবাধিকার সংস্থার সামনে মুখ না খুলতে এবং কান্নাকাটি না করতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরিবারটিকে শান্ত রাখতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু সময় গড়ালে দেখা যায়, তা ছিল কেবল মুখ বন্ধ রাখার কৌশল।
আয়েশা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
”আমার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে মিডিয়ার সামনে অপরাধী বানিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশ কেঁদেছিল, কিন্তু মন্ত্রীরা ফোন করে আমাকে চুপ থাকতে বলেছিলেন।”
দীর্ঘ আট বছর পর বিচারে আলো
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে একরাম হত্যার বিচারের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ আট বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৌঁছেছে সেই রাতের নথিপত্র, উচ্ছেদের দলিল, অডিও রেকর্ড এবং আয়েশা বেগমের জমানো চোখের জল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে এবং আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।
বুকের ভেতর চেপে রাখা দীর্ঘদিনের পাথর নিয়ে আয়েশা বেগম বলেন,
”আমার স্বামী কোনো ইয়াবা কারবারি ছিলেন না, চক্রান্ত করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। যারা আমার জীবন ছাই করে দিয়েছে, আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চাই।”

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]