ঢাবিতে তোফাজ্জল হত্যা: দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার, অপেক্ষায় পরিবার
একজন মানুষকে চোর সন্দেহ করা হয়েছিল। পরে জানা যায়, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। তাকে খাবারও খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু সেই রাতেই আবার শুরু হয় নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের একটি কক্ষে প্রাণ হারান তোফাজ্জল হোসেন।
সেই ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি বিচার। ২৮ আসামির বিরুদ্ধে পিবিআই অভিযোগপত্র দিলেও তাদের মধ্যে ১৭ জন এখনো পলাতক বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও মামলার সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে জানা গেছে। পলাতকদের গ্রেপ্তার করা গেছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
তোফাজ্জলের পরিবারের কাছে এই দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু একটি মামলার তারিখ নয়, একজন স্বজনকে হারানোর পর ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষা।
মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া বলেন, “দুই বছর হয়ে গেছে, এখনো বিচার শুরু হয়নি। আমাদের তো একটা ক্ষোভ থাকতেই পারে। আমরা বিচার চাই।”
যে রাতে থেমে যায় তোফাজ্জলের জীবন
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন তোফাজ্জল হোসেন। অভিযোগ করা হয়, তিনি মোবাইল ফোন চুরি করেছেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে ধরে হলের অতিথি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তাকে মারধর করা হয়। পরে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ বুঝতে পেরে তাকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়।
কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি ঘটনা।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে তাকে হলের দক্ষিণ ভবনের আরেকটি অতিথি কক্ষে নেওয়া হয়। জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে তাকে আবার মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ভিডিওতে তোফাজ্জলকে নির্যাতনের আগে খাবার খাওয়ানোর দৃশ্যও দেখা যায়। সেই দৃশ্যটি পরে মামলার ঘটনাপ্রবাহের অন্যতম আলোচিত অংশ হয়ে ওঠে।
ফোন করেছিলেন তানিয়া, চেয়েছিলেন শুধু ছেড়ে দিতে
তোফাজ্জলকে মারধরের খবর পেয়ে তার মামাতো বোন তানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর নম্বরে ফোন করেছিলেন বলে মামলার বর্ণনায় এসেছে।
তিনি জানিয়েছিলেন, তোফাজ্জল মানসিকভাবে অসুস্থ। তাকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।
তানিয়ার অভিযোগ, তার অনুরোধের পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
একজন স্বজনের শেষ চেষ্টা ছিল একটি ফোনকল। কিন্তু সেই ফোনকল তোফাজ্জলকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
দুই বছরেও বিচার শুরু হয়নি
তোফাজ্জল হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ।
প্রাথমিক তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের শেষ দিকে ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নারাজির পর আদালত পিবিআইকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।
পুনঃতদন্ত শেষে পিবিআই ২৮ জনের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগপত্র দেয়। ২০২৬ সালের ১০ মার্চ আদালত সেই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন এবং পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দুই আসামি কারাগারে এবং নয়জন জামিনে রয়েছেন। বাকি ১৭ জন এখনো পলাতক। পলাতকদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
তদন্ত শেষ, এখন অপেক্ষা আদালতের
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম বলেন, তদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এখন পলাতকদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানার।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে তা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে। সেখানে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম বলেন, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন এখনো আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
তোফাজ্জল শুধু একটি মামলার নাম নয়
তোফাজ্জল হোসেনের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নে। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছিলেন তিনি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবা-মা দুজনকেই হারানোর পর তার মানসিক স্বাস্থ্যে সমস্যা দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যরা তার চিকিৎসা ও দেখাশোনা করতেন।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের রাত সেই পরিবারের জন্য সবকিছু বদলে দেয়।
আজ দুই বছর পরও আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রশ্ন—তোফাজ্জলের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিচার কবে শুরু হবে?
পরিবারটির অপেক্ষা এখন একটি তারিখের জন্য নয়, ন্যায়বিচারের জন্য।
আর ২৮ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত তারিখে পলাতক আসামিদের বিষয়ে আদালতে কী প্রতিবেদন আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পরিবার ও মামলার সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]