কক্সবাজারের উখিয়া থানায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় এমন ব্যক্তিদের ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ হিসেবে আদালতে চালান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যাদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে মামলার বাদীরাও অবগত নন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উখিয়ায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিবর্তে থানা পুলিশ একটি প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠছে, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে রাজনৈতিক তদবিরের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষকে আটক দেখিয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। এতে একদিকে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে নির্দোষ ব্যক্তিরা মামলার ফাঁদে পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
উখিয়ার বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী একটি মহলের সুপারিশে পুলিশ নির্বিচারে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিএনপির দায়ের করা মামলাগুলোতেও অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে চালান দিচ্ছে। তাদের মতে, এটি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক কৌশল, যা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। উখিয়ার তরুণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার সাফাত ফারদিন রামিম চৌধুরী তার ফেসবুক পোস্টে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর তদবিরে কাউকে গ্রেপ্তার করে বিএনপির দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে চালান দেওয়ার যে প্র্যাকটিস শুরু হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
এছাড়া উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, “উখিয়া থানার ওসি মোটরসাইকেল আর লীগের চুনোপুঁটি ধরতে ব্যস্ত, রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
স্থানীয় মহল মনে করছেন, এমন মন্তব্যে পুলিশের অগ্রাধিকার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রতিরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে অনুষ্ঠিত উখিয়ার গণআন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতা ও সমাজকর্মী মাহবুব আহমদ শাকিল তার ফেসবুক পোস্টে তীব্র ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “উখিয়া থানা পুলিশের ‘ডেভিল ধরার’ সফল অভিযান দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাঘববোয়ালদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রেখে ৪–৫ বছর আগে অর্থের বিনিময়ে মিছিলে অংশ নেওয়া ৫০–৬০ বছর বয়সী অসহায় মানুষদের আওয়ামী লীগের দোসর বানিয়ে গ্রেপ্তার করার অপচেষ্টা চলছে। কড়তালি পাওয়ার মতোই এক সাফল্য।”
কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, “পুলিশের এমন আচরণ শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি প্রতারণার শামিল।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী অজ্ঞাতনামা আসামির ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করে চার্জশিট দাখিল করা বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক পরিচয় বা তদবিরের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে চালান দেওয়া গুরুতর আইন লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।
অন্যদিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, থানা পুলিশ কাউকে আটক করার পরও সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ছবি, প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক তথ্য সরবরাহ করে না। এতে পুলিশের কর্মকাণ্ড কতটা স্বচ্ছ, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর আহম্মদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “নিরীহ কাউকে কোনো মামলায় চালান দেওয়া হয়নি। যাদের আটক করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রাথমিক তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় আদালতে পাঠিয়েছেন। যথাযথ তদন্ত ছাড়া কাউকে আদালতে পাঠানোর সুযোগ নেই।”
স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, উখিয়া থানা পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]