উখিয়ার ওসি জিয়া’র নির্দেশনায় ‘ইয়াবাকাণ্ডে’ জড়িত পাঁচ পুলিশ!
উখিয়ার ওসি জিয়া’র নির্দেশনায় ‘ইয়াবাকাণ্ডে’ জড়িত পাঁচ পুলিশ!
র্যাব-১৫–এর তিন শতাধিক সদস্যের গণবদলির রেশ কাটতে না কাটতেই কক্সবাজারে নতুন করে আলোচনায় এসেছে উখিয়া থানার এক বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযান। অভিযোগ উঠেছে—অভিযানে জড়িত পাঁচ পুলিশ সদস্য মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রকৃত ইয়াবা মালিককে ছেড়ে দিয়ে নির্দোষ এক কর্মচারীকে মামলায় আসামি করেছেন।
ঘটনার সময় মাদক ও নগদ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও সামনে এসেছে। এজাহার, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে বেরিয়ে এসেছে বিস্ময়কর অসঙ্গতি।
অভিযানের ঘটনা
৩০ নভেম্বর রাতে উখিয়া থানার এসআই (নিরস্ত্র) সঞ্জিত কুমার মণ্ডল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে থানায় মামলা করেন।
এজাহারে উল্লেখ—বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়ে ওসি জিয়াউল হকের নির্দেশে রাত ১১টা ৫০ মিনিটে অভিযানে যান এসআই সঞ্জিতসহ চার পুলিশ সদস্য—
এসআই ফজলে রাব্বী ইশান
কনস্টেবল লিমন
কনস্টেবল মাহবুব
কনস্টেবল শরীফ
দাবি করা হয়, দারোগাবাজার এলাকায় পালানোর সময় রাজাপালংয়ের হারুনুর রশীদকে ধরা হয় এবং তার পকেট থেকে ৬০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। আদালত পরদিন তাকে কারাগারে পাঠায়।
এজাহার বনাম বাস্তবতা: সামনে এলো বিরাট অসামঞ্জস্য
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, এজাহারের সাক্ষী এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানান—
সে রাতে হারুনুর রশীদের মালিক উত্তম বিশ্বাসকেও পুলিশ আটক করেছিল।
উত্তম দক্ষিণ স্টেশনের ‘বাদল ক্রোকারিজ’-এর মালিক, যেখানে কর্মচারী ছিলেন হারুন।
প্রথম সাক্ষী (অডিও/ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত) বলেন—
“একজন কনস্টেবল আমাকে ঘটনাস্থলে ডাকেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে সাক্ষী করা হয়।”
“পুলিশ হারুনের পকেট থেকে তিনটি প্যাকেট বের করে আমাকে খুলতে দেয়—ভেতরে ইয়াবা ছিল।”
“হারুন ইশারা করে ইয়াবার মালিক হিসেবে তার দোকান মালিক উত্তমকে দেখান। পুলিশ সেটির ভিডিও করে।”
“পরে উত্তম ও হারুন—দুজনকেই থানায় নিয়ে যায়।”
“উত্তমের কাছে থাকা ৩০ হাজার টাকা পুলিশ নিয়ে যায়।”
দ্বিতীয় সাক্ষী বলেন—
“উত্তমকে আমাদের সামনেই থানায় নেওয়া হয়েছিল। পরে শুনেছি টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান—
“পুলিশ সিভিল পোশাকে ছিল, দোকানে এসে সিগারেট নিয়েছে।”
“উত্তম ও আরেক ছেলেকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেছে।”
“বাজারে পরে শুনি ৩.৫ লাখ টাকা দিয়ে উত্তমকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে।”
“একটি দোকানের সিসিটিভিতে পুলিশের হাতে উত্তমের দোকান থেকে শপিং ব্যাগ নেওয়ার দৃশ্য আছে।”
যদিও উত্তম বিশ্বাস আটক হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন, তবে তিনি বলেন—
“হারুন আমার দোকানে কাজ করত। তাকে দেখতে থানায় গিয়েছিলাম।”
হারুনের পরিবারের অভিযোগ
কারাগারে থাকা হারুনুর রশীদের বাবা জাফর আলম বলেন—
“আমার ছেলে পান-সিগারেটও খায় না। দোকানে কাজ করত, পড়ালেখা করত। উত্তম নিজে বাঁচতে তাকে ফাঁসিয়েছে। আমি ছেলের মুক্তি চাই।”
অভিযানে থাকা পুলিশের স্বীকারোক্তি
প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আরেক অডিওতে অভিযানে থাকা এক পুলিশ সদস্যও উত্তমকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে এসআই সঞ্জিত বলেন—
“এজাহারের বাইরে কোনো কথা বলার নির্দেশ নেই।”
ওসি’র দাবি
উখিয়া থানার ওসি জিয়াউল হক বলেন—
“অভিযানের সময় তারা আমার সঙ্গে লাইভ ভিডিও কলে ছিলেন। উত্তম নামে কাউকে সেদিন থানায় আনা হয়নি।
৬০০ ইয়াবা পাওয়ায় একজনের নামে মামলা হয়েছে। তারপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
উর্দ্ধতন কর্মকর্তার বক্তব্য
উখিয়া সার্কেল এএসপি রকিবুল হাসান বলেন—
“আমি ছুটিতে ছিলাম—আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। যদি সত্য হয়—জড়িত যে-ই হোক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পটভূমি
এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি ইয়াবা জব্দ ও অর্থ বণ্টনে অনিয়ম নিয়ে যুগান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]