খুঁজুন
, ,

বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ, বছরজুড়ে আলোচনায় ‘সন্ত্রাসী’ বড় সাজ্জাদ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:০১ অপরাহ্ণ
বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ, বছরজুড়ে আলোচনায় ‘সন্ত্রাসী’ বড় সাজ্জাদ

নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেয়ে গুলি, প্রকাশ্যে হত্যা—এমন নানা ঘটনায় চট্টগ্রামে বিদায়ী বছরজুড়েই আলোচনায় ছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। চলতি বছরের শুরুতেই গতকাল শুক্রবারও চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি করার ঘটনায় এসেছে বড় সাজ্জাদের নাম। বিদেশে পলাতক এই ‘সন্ত্রাসী’ সহযোগীদের মাধ্যমে দেশে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করছেন বলে দাবি পুলিশের। তাঁর দলের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও এখনো অধরা বেশির ভাগ সহযোগী।

পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে রয়েছেন। গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ অন্তত ১০টি হত্যার ঘটনায় বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। কখনো আধিপত্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে, কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবে সাজ্জাদের অনুসারীরা এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি পুলিশের। যদিও সাজ্জাদ আলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কে এই বড় সাজ্জাদ
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী। তাঁর নাম প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৯৯ সালের ২ জুন পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানকে খুনের ঘটনায়। বাড়ির সামনে খুন হন লিয়াকত। এ হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদ জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ থাকলেও কেউ আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়ায় ওই হত্যা মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়ে যান।

চট্টগ্রামে ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদ নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ২০০০ সালের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বড় সাজ্জাদ। ২০০৪ সালে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন সাজ্জাদ। এরপর বিদেশে পালিয়ে যান।
২০০০ সালের ১২ জুলাই। মাইক্রোবাসে করে একটি দলীয় সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মী। পথে বহদ্দারহাটে ওই মাইক্রোবাস থামিয়ে ব্রাশফায়ার করে সন্ত্রাসীরা। ঘটনাস্থলেই ওই ছয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীসহ আটজন মারা যারা যান। চট্টগ্রামে ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদ নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ২০০০ সালের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বড় সাজ্জাদ। ২০০৪ সালে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন সাজ্জাদ। এরপর বিদেশে পালিয়ে যান।

শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলীকে নিয়ে দল গড়েন বড় সাজ্জাদ। তাঁদের হাতেই ছিল অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ। একটি অস্ত্র মামলায় ২১ বছর কারাদণ্ড হয় ম্যাক্সনের। সেই দণ্ড নিয়ে পলাতক অবস্থায় ২০২২ সালের শেষের দিকে ভারতে মারা যান ম্যাক্সন। সরোয়ারও একসময় দল ছাড়েন। ২০১৫ সাল থেকে দেশে দলের হাল ধরেন ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ।

গত ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের চান্দগাঁও মোহরা এলাকায় মোহাম্মদ ইউনুসের বাসায় হানা দেয় একদল অস্ত্রধারী। অস্ত্রধারীদের একজন বলতে থাকেন, ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।’ এ কথার পরই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। ব্যবসায়ীর পা, হাঁটু, কোমরসহ শরীরের চারটি স্থানে গুলি লাগে।
পুলিশ জানায়, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ২৫ জন সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছেন। দেশে মূল নেতৃত্বে রয়েছেন ১৭ মামলার আসামি ছোট সাজ্জাদ। তিনি গত বছর কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর হয়ে ১৫ মামলার আসামি রায়হান নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ওসিকে পেটানোর হুমকি ফেসবুকে
পুলিশের অভিযানে ক্ষুব্ধ হয়ে গত বছরের ২৯ জানুয়ারি ছোট সাজ্জাদ নিজের ফেসবুক আইডি থেকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানকে প্রকাশ্যে পেটানোর হুমকি দেন। ঘটনার আগের মাসে নগরের অক্সিজেন এলাকায় একটি বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। কিন্তু পুলিশ সদস্যদের গুলি করে পাশের ভবনের ছাদে উঠে পালিয়ে যান ছোট সাজ্জাদ। গুলিতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজন।

বিদেশে ব্যবসা, দেশে ভাড়া ঘর থেকে অনেক টাকা পাই। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করে চাঁদাবাজি, খুন করব। উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা।
—সাজ্জাদ আলী
ছোট সাজ্জাদের হুমকির পরদিন নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ সাজ্জাদকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরে ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেন চট্টগ্রামের কিছু লোকজন। ধরা পড়ার পর সাজ্জাদকে ছাড়িয়ে আনতে ‘বান্ডিল বান্ডিল’ টাকা ছিটানোর কথা বলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্না শারমিন। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই কারাগারে রয়েছেন।

সরোয়ারকে সরাতে গিয়ে জোড়া খুন
গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে, যেখানে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায় পুলিশ। ওই রাতে রুপালি রঙের একটি প্রাইভেট কার কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে বাকলিয়া এক্সেস রোডে আসতে থাকে। গাড়িটি শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে কিছুদূর যাওয়ার পর পেছন থেকে পাঁচটি মোটরসাইকেল সেটিকে ধাওয়া করা হয়। একপর্যায়ে প্রাইভেট কারটিতে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকেন মোটরসাইকেল আরোহীরা। প্রাইভেট কারের ভেতর থেকেও মোটরসাইকেল আরোহীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিতে অনেকটা ঝাঁঝরা হয়ে যায় গাড়িটি। এ সময় প্রাইভেট কারে থাকা দুই ব্যক্তি নিহত হন। তাঁরা হলেন বখতিয়ার হোসেন (৩০) ও মো. আবদুল্লাহ (৩২)। তাঁরা বড় সাজ্জাদের বাহিনী থেকে দলছুট ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গাড়িতে সরোয়ারও ছিলেন, তবে তিনি বেঁচে যান।

এ মামলায় মো. হাসান ও মেহেদী হাসান নামের দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার দুজন ছোট সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পোশাক কারখানা থেকে ঝুট কেনাবেচার নিয়ন্ত্রণ এবং বড় সাজ্জাদের আধিপত্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যসহ পাঁচ কারণে ওই রাতে সরোয়ার হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। সরোয়ার ওই সময় প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর দুই অনুসারীর মৃত্যু হয়েছে।

আকবর-সরোয়ারকে প্রকাশ্যে হত্যা
আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর ও সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা—দুজনই ছিলেন বড় সাজ্জাদের সহযোগী। ২০১৫ সালের পর তাঁরা সাজ্জাদের দল থেকে বেরিয়ে যান। গত বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় আকবরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় সাজ্জাদ ও তাঁর সহযোগীদের আসামি করা হয়েছে।

বাকলিয়া এক্সেস রোডের ঘটনায় সরোয়ার বেঁচে গেলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। তাঁকে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় গত বছরের ৫ নভেম্বর। এ সময় তিনি চট্টগ্রাম-৮ আসনে (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহসহ আরও পাঁচজন।

পুলিশ জানায়, সরোয়ার ১৫ মামলার আসামি ছিলেন। তাঁর ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করছেন এক শুটার। বাঁহাতি সেই শুটার কে, তা বলতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সরোয়ারকে খুনের ঘটনায় জড়িত বাঁহাতি সেই শুটার কে তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

চাঁদা না পেলেই গুলি
গতকাল চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ওই সময় ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাসায় ছিলেন। তবে গুলির ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নির্দেশে তাঁর সহযোগীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। মুজিবুর রহমানও দাবি করেন, বিদেশি একটি মুঠোফোন নম্বর থেকে কল দিয়ে বড় সাজ্জাদ পরিচয়ে তাঁর কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।

এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর নগরের পাঁচলাইশ হামজার বাগ এলাকায় মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে হামলা করেন সন্ত্রাসীরা। ভবনমালিকের কাছে এর আগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। এ ঘটনায়ও সাজ্জাদের সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে।

গত ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের চান্দগাঁও মোহরা এলাকায় মোহাম্মদ ইউনুসের বাসায় হানা দেয় একদল অস্ত্রধারী। অস্ত্রধারীদের একজন বলতে থাকেন, ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।’ এ কথার পরই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। ব্যবসায়ীর পা, হাঁটু, কোমরসহ শরীরের চারটি স্থানে গুলি লাগে। তবে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। এ ঘটনার পর প্রথম আলোকে ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘যেভাবে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়, ভাবিনি বাঁচব। এখনো বেঁচে আছি বলে মনে হয় না। সাজ্জাদ বিদেশে বসে দেশে এসব করার সাহস কীভাবে পায়। তাঁর সহযোগীরা এত অস্ত্র কোথা থেকে পায়।’

ধরা পড়েননি দলের অনেকেই
দেশে বড় সাজ্জাদের দলের নেতৃত্বে থাকা ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকলেও বেশির ভাগ সদস্য এখনো ধরা পড়েননি। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তাঁর প্রধান দুই সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ইমন। তাঁদের বিরুদ্ধে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ জানায়, ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকায় তাঁর হয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোহাম্মদ রায়হান। হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয় রায়হানের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুজন কারাগার থেকে জামিনে বের হন। এরপর ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রায়হান। ছোট সাজ্জাদ পুনরায় কারাগারে গেলে সাজ্জাদের অস্ত্রভান্ডারের দেখভাল করছেন এই রায়হান। একাধিক খুনের ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে

গত ২৫ অক্টোবর মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারাবটতল বাজারসংলগ্ন কায়কোবাদ জামে মসজিদের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদলের কর্মী আলমগীর আলমকে। মৃত্যুর আগে আলমগীরের মুঠোফোনে কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে আলমগীরকে রায়হানের বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা যায়। রায়হানের নাম উল্লেখ করে অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তির উদ্দেশে আলমগীর মুঠোফোনে বলেন, ‘তুমি যে শোডাউন করিয়েছ আতঙ্ক সৃষ্টি করে, আমাকে তো মেরেও ফেলতে পারত, তুমি তো ও রকম মানুষ নিয়ে এসে আমাকে মেরে ফেলতে পারো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে তাড়ানোর জন্য তুমি এসব করছ।…ওরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসেছে আমাকে থ্রেট দিতে।’

গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট এলাকার এক ওষুধের দোকানিকে মুঠোফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে রায়হানের বিরুদ্ধে। রায়হান তাঁকে বলেন, ‘আমি ঢাকাইয়া আকবর খুনের মামলার ২ নম্বর আসামি রায়হান, মাথার খুলি উড়ায় ফেলব।…আকবর সি বিচে কীভাবে পড়ে ছিল তুই দেখেছিস? তুইও পড়ে থাকবি।’ চাঁদা না পেয়ে ১ আগস্ট চান্দগাঁও থানার মোহরা এলাকার এক ব্যবসায়ীকে গুলি করার অভিযোগও ওঠে রায়হানের বিরুদ্ধে। রায়হানের নামে অন্তত ১৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা মামলা।

সাজ্জাদের আরেক সহযোগী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ফটিকছড়ির কাঞ্চনগরের মো. মুসার ছেলে। জোড়া খুন ও ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ সাত মামলার আসামি তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর কিছু ছবিতে ১৫-২০টি অস্ত্র বহনের প্রমাণ রয়েছে। জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করে এনেছিলেন মোবারক।

যা বলছেন সাজ্জাদ আলী
বিদেশে বসে খুনের নির্দেশ, চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদেশে ব্যবসা, দেশে ভাড়া ঘর থেকে অনেক টাকা পাই। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করে চাঁদাবাজি, খুন করব। উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা।’

ছোট সাজ্জাদ, রায়হানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেন সাজ্জাদ আলী। তিনি বলেন, ‘সাজ্জাদ, রায়হানের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। তবে সরোয়ার সন্ত্রাসী, সেটি জানি। পুলিশ বের করুক তাকে কারা মেরেছে।’

জানতে চাইলে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, খুনের মামলার বেশির ভাগ আসামিকে পুলিশ ধরেছে। বড় সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে চেষ্টা চলছে।

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যায় ৪ জন গ্রেপ্তার, স্বীকারোক্তির দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৫১ অপরাহ্ণ
কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যায় ৪ জন গ্রেপ্তার, স্বীকারোক্তির দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কুমিল্লার ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। নিহত অপ্রতিমের বয়স প্রায় ১৩ বছর। নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারদের বয়স প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের মধ্যে দুজনের বয়স ১৮ বছরের বেশি এবং একজনের বয়স ১৮ বছরের কম হতে পারে। তবে সবার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কিশোর অপরাধ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। তাদের সঙ্গে অপ্রতিমের পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল এবং তারা নিয়মিত একসঙ্গে আড্ডা দিত। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তাদের কেউ কেউ অপ্রতিমের চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছর বড়।

অপ্রিতমের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন উদ্ধারের তথ্য জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি প্রধান সন্দেহভাজন তুহিনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ঘটনা স্বীকার করেছে। এখন পুলিশ আইনানুগ পরবর্তী কার্যক্রম, including আদালতে জবানবন্দি গ্রহণের বিষয়ে কাজ করছে।

পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে। উদ্ধার করা আলামতের ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে। নিহতের ময়নাতদন্তও সম্পন্ন হয়েছে এবং রোববার তার দাফন করা হয়েছে।

দ্রুত বিচার শেষ করার আশা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো অপ্রতিম হত্যার বিচারও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পুলিশ আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করবে। এরপর বিচার বিভাগ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কুড়িগ্রামে সার না পেয়ে কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ, পরে উদ্ধার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ
কুড়িগ্রামে সার না পেয়ে কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ, পরে উদ্ধার

কুড়িগ্রামের উলিপুরে সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে উদ্ধার করেন। গতকাল শুক্রবার রাতে উপজেলার বজরা ইউনিয়নের গাবেরতল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

এলাকাবাসী ও ‎‎স্থানীয় কৃষক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে চাহিদামত সার না পাওয়ায় কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। ওই এলাকার দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার সরকার স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়ে ডিলারের কাছে জমা দিলেও কৃষকরা সার পাচ্ছিলেন না। এ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গতকাল সন্ধ্যার পর গাবেরতল বাজারের আব্দুল গফফারের কীটনাশক ও সারের দোকানে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার সরকারকে দেখতে পান কয়েকজন কৃষক। এ সময় ক্ষুব্ধ কৃষকরা তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ১ ঘণ্টা পর ওই কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার সরকার বলেন, ‘আমি প্রায় দিন ওই কীটনাশকের দোকানে বসে আড্ডা দেই। গতকাল সন্ধ্যার পর হঠাৎ করেই স্থানীয় কৃষকরা আমাকে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরে আশপাশের লোকজন উত্তেজনা দেখে কীটনাশকের দোকানে আমাকে বসিয়ে রেখে দোকান বন্ধ করে দেন। প্রায় ১ ঘন্টা পর পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।’
তার উপর কৃষকদের ক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিলাররা যখন সার বিতরণ করেন তখন আমরা সেখান থেকে বিষয়টি দেখাশুনা করে থাকি। অনেকে যথা সময়ে সার পান না। তাদের ধারণা আমার কারনেই তারা সার পাচ্ছে না। এ কারনে আমাকে দেখে ক্ষুব্ধ হন।’

উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার সরকারকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়। পরে তাকে সহকর্মীদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘সার সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে অবরুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি। অনেকে বিভিন্ন কারনে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিত ভাবে ওই কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। পরে থানা প্রশাসনের সহযোগিতায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে উদ্ধার করা হয়েছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.টি.এম আরিফ বলেন, ‘আমি যতটুকু শুনেছি ওই উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তার ব্যক্তিগত কাজে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। এ সময় কিছু স্থানীয় লোক ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।’

এক আইফোনের জন্য মেরে ফেললি, এ রকম ১০ ফোন মুক্তিপণ চাইতি – দিতাম’

আহনাফ হামিম, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১২ অপরাহ্ণ
এক আইফোনের জন্য মেরে ফেললি, এ রকম ১০ ফোন মুক্তিপণ চাইতি – দিতাম’

একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমকে হারিয়ে দিশাহারা তার পরিবার। শুক্রবার বিকেল থেকে ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকা পরিবার শনিবার তার মরদেহ উদ্ধারের খবর পায়।

ইশায়াতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্‌ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আবদুল হাকিম বলেন, ‘বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলের এমন মৃত্যু আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবার এ ঘটনায় শোকাহত।’

মরদেহ উদ্ধারের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ইশায়াতের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘শুধুমাত্র একটি আইফোনের জন্য ছেলেটাকে মেরে ফেললি। এ রকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম। নিখোঁজ অপ্রতীমকে মেরে ফেলা হয়েছে। হে আল্লাহ, বাবা-মাকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করুন।’

ময়নাতদন্তের জন্য ইশায়াতের মরদেহ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম।তিনি বলেন, ‘ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’

এর আগে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে ইশায়াতের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

ইশায়াত শাহরিয়ার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকত।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয় ইশায়াত। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। দীর্ঘ সময় তার খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে শনিবার তার মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা।