রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যা:পাঁচ অস্ত্রধারী শনাক্ত, সবাই বিএনপির সঙ্গে ‘সম্পৃক্ত’
চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত পাঁচ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। গতকাল রোববার রাত ১০টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলাও দায়ের হয়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান গ্রুপের সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের কাছে শটগান ছিল।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় ত্রাস হিসেবে পরিচিত রায়হান বাহিনীর সদস্যরাই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। রায়হানকে রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে রায়হান ও তার সহযোগীরা স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও দাবি রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাউজানের এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। রাউজানে যারা চাঁদাবাজি ও খুনের মতো অপরাধ করছে, তাদের পুলিশ কেন ধরছে না? অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে গ্রেপ্তার করতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম বলেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো দলনেতা নেই। তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপকর্ম করে থাকে। তবে রাজনীতিবিদদেরও বুঝতে হবে, দাগি সন্ত্রাসীদের কাছে টানা উচিত নয়। আমি সন্ত্রাসীদের পক্ষে নই। যুবদল নেতা মাকসুদুর হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা
গত শনিবার দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে।
সিসিটিভিতে যাদের দেখা গেছে
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে পাঁচ অস্ত্রধারীর পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন রাউজানের কদলপুর এলাকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে দামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম ওরফে দিদার, রাউজান পৌরসভার ফরেস্ট অফিস এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ, রাউজান সদর ইউনিয়নের পূর্ব রাউজান এলাকার মোহাম্মদ জাহেদ এবং মোহাম্মদ আবছার।
ফুটেজ অনুযায়ী, প্রথমে ইলিয়াস ও দিদার মাকসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরে ইউসুফ, জাহেদ ও আবছার দৌড়ে গিয়ে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে খুনিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের বিরুদ্ধে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও নগরীর বিভিন্ন থানায় ১২টি হত্যাসহ মোট ২৪টি মামলা রয়েছে।
তার সহযোগী দামা ইলিয়াসের বিরুদ্ধে রয়েছে পাঁচটি হত্যাসহ ১৮টি মামলা। ইউসুফের বিরুদ্ধে রাউজান থানায় দুটি হত্যাসহ চারটি মামলা রয়েছে। এছাড়া দিদার, জাহেদ ও আবছারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়
রাউজানের পূর্ব সীমান্তজুড়ে থাকা দুর্গম পাহাড়গুলো দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পাহাড়তলী, কদলপুর, রাউজান সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সংঘটিত অধিকাংশ খুন, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় পাহাড় থেকে আসা সন্ত্রাসীরা জড়িত।
তাদের দাবি, অভিযানে অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীরা ঘটনার পর আবার পাহাড়ের গোপন আস্তানায় ফিরে যায়। যুবদল নেতা মাসুদ হত্যার পরও হামলাকারীরা একইভাবে পালিয়ে যায়।
পরিবারের দাবি, দ্রুত গ্রেপ্তারেই বের হবে হত্যার রহস্য
নিহতের বড় ভাই ও বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বলেন, “আমাদের পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। কে বা কারা কী কারণে তাকে হত্যা করেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। তবে সিসিটিভিতে যাদের দেখা গেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যার কারণও স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
বালু মহাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের গুঞ্জন
হত্যাকাণ্ডের পেছনে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি এলাকায় আলোচনায় রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী বাজারসংলগ্ন চম্পাতলী ঘাট এলাকার একটি বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন নিহত মাকসুদুল। পাশাপাশি রাঙ্গুনিয়ার সীমান্তবর্তী রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলার ঘাট এলাকার একটি বালুমহালও তার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বলেন, “হত্যার তদন্তে এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত।”
জানাজায় মানুষের ঢল, ক্ষোভ নেতাকর্মীদের
রোববার বিকেলে বেতাগী ইউনিয়নের চম্পাতলী ঈদগাহ মাঠে মাকসুদুল হকের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে তার মরদেহ এলাকায় পৌঁছালে স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। একনজর দেখতে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ।
জানাজার আগে বিএনপি ও যুবদলের নেতারা বক্তব্য দেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি ইউসুফ চৌধুরী বলেন, প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
এ সময় নেতারা অভিযোগ করেন, হত্যার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলা হয়নি এবং চিহ্নিত আসামিরা গ্রেপ্তার হয়নি।
পেয়ারুল হক স্বপন বলেন, “জানাজায় মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে, এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। তিনি অসহায় মানুষের বন্ধু ছিলেন। অথচ হত্যার ২৪ ঘণ্টা পরও মামলা হয়নি, আসামিরা ধরা পড়েনি। আমরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি মো. জহির উদ্দিন বলেন, “মামলাটি রাউজান থানায় হবে। তদন্তে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।”
রাঙ্গুনিয়া-রাউজান সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, “অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়া পাঁচজন বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর ক্যাডার বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের পরিচয়ও বের করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। খুনিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]