জাইমা রহমানকে নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ পোস্ট’ বিতর্ক: গ্রেপ্তারের পর সামনে এলো ভুয়া স্ক্রিনশটের অভিযোগ, নতুন প্রশ্নে সিয়াম মামলা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার কলেজছাত্র সাবিদুল ইসলাম সিয়ামকে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগে গ্রেপ্তার করার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’ দাবি করেছে, সিয়ামের বিরুদ্ধে প্রচারিত স্ক্রিনশট ও ভিডিও প্রযুক্তিগত কারসাজির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল এবং সেগুলোর ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গড়ে ওঠে।
সাবিদুল ইসলাম সিয়াম আখাউড়া উপজেলার আজমপুর গ্রামের শাহনেওয়াজ মিয়ার ছেলে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। গত রোববার রাতে জেলার সদর উপজেলার একটি আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। সোমবার দুপুর পর্যন্ত তিনি আখাউড়া থানা হাজতে ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাতে আখাউড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পলাশ মিয়া এবং পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রিফাতুল ইসলাম পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, ‘সাবিদুল ইসলাম সিয়াম’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে। তারা এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।
এরপরই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এ অবস্থায় ‘দ্য ডিসেন্ট’ একটি বিস্তারিত প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ব্রাউজারের ডেভেলপার টুলের ‘ইন্সপেক্ট এলিমেন্ট’ ফিচার ব্যবহার করে সিয়ামের নামে ভুয়া স্ক্রিনশট ও স্ক্রিন রেকর্ড তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ জুন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) পরিদর্শনে যান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। সেদিন রাত ৯টা ৫৩ মিনিটে তিনি ১৫টি ছবি সংযুক্ত করে একটি ফেসবুক পোস্ট করেন। পোস্টের একটি ছবিতে তাকে ডি-বক্সের ভেতর থেকে গোলবারের দিকে ফুটবলে শট নিতে দেখা যায়। ছবিটি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রশংসা কুড়ায়।
তিন দিন পর, ২০ জুন বিকেল ৫টা ৭ মিনিটে ‘Ryan Draper’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, ‘Sabidul Islam Siam’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যসহ ওই ছবিটি পোস্ট করা হয়েছিল।
স্ক্রিনশটটি প্রকাশের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন নেতাকর্মী সেটি শেয়ার করে অভিযুক্তের বিচারের দাবি জানান। পরে একই অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়।
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়েও ওই কথিত পোস্টের অন্য কোনো স্ক্রিনশট, আর্কাইভ বা বিকল্প সংস্করণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, Ryan Draper-এর প্রকাশিত একটিমাত্র স্ক্রিনশটই পরবর্তীতে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়ে।
রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্ট-চেকার সোহানুর রহমানও স্ক্রিনশটটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, এত আলোচিত ও বিতর্কিত কোনো পোস্টের একটিমাত্র স্ক্রিনশট পাওয়া অস্বাভাবিক। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট কিছু ভুয়া পরিচয়ের অ্যাকাউন্ট অতীতেও জাইমা রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানোর অভিযোগে আলোচনায় এসেছে।
পরবর্তীতে Ryan Draper একটি স্ক্রিন রেকর্ড প্রকাশ করে দাবি করে যে তাদের কাছে ভিডিও প্রমাণও রয়েছে। আওয়ামী লীগপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট ‘অরণ্য আবির’সহ একাধিক অ্যাকাউন্ট সেই ভিডিও পুনরায় শেয়ার করে।
তবে দ্য ডিসেন্ট বলছে, ভিডিওটিই বরং জালিয়াতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কথিত পোস্টের ছবিটি ফেসবুক ফিডে দৃশ্যমান হলেও প্রোফাইলের ‘Photos’ বিভাগে নেই, যা প্রযুক্তিগতভাবে অস্বাভাবিক। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, স্থানীয়ভাবে HTML ও CSS কোড পরিবর্তন করে এমন দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ জুন সকাল ১০টা ৫ মিনিটে সিয়াম আসলে অন্য একটি ফেসবুক পেজের পোস্ট শেয়ার করেছিলেন, যা পরে ‘Unavailable’ হয়ে যায়। অভিযোগ করা হয়েছে, সেই পোস্টের কোড সম্পাদনা করে জাইমা রহমানের ছবি ও কুরুচিপূর্ণ ক্যাপশন যুক্ত করে ভুয়া স্ক্রিনশট এবং ভিডিও তৈরি করা হয়।
দ্য ডিসেন্ট আরও জানায়, বেসিক কোডিং জানা যেকোনো ব্যক্তি ব্রাউজারের ডেভেলপার টুল ব্যবহার করে কোনো ওয়েবপেজ বা ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশন, ছবি, সময়, রিঅ্যাকশনসহ বিভিন্ন উপাদান স্থানীয়ভাবে পরিবর্তন করে স্ক্রিনশট বা স্ক্রিন রেকর্ড তৈরি করতে পারেন। বিষয়টি প্রদর্শনের জন্য তারা নিজেরাও Ryan Draper-এর একটি পোস্ট পরিবর্তন করে একই ধরনের স্ক্রিনশট ও ভিডিও তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভিডিও বিশ্লেষণে আরও কিছু অসঙ্গতির কথাও তুলে ধরা হয়। প্রথম প্রকাশিত স্ক্রিনশটে দুটি মন্তব্য ও তিন ধরনের রিঅ্যাকশন দেখা গেলেও ভিডিওতে কোনো মন্তব্য নেই এবং রিঅ্যাকশনের ধরনও ভিন্ন। দ্য ডিসেন্টের দাবি, ভিডিওতে দেখা রিঅ্যাকশনগুলো সিয়ামের ১৮ জুনের মূল পোস্টের সঙ্গে মিলে যায়।
অন্যদিকে ২১ জুন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে সিয়াম লিখেছিলেন, তার নামে ছড়িয়ে দেওয়া পোস্ট ও স্ক্রিনশট সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং এডিট করা। তিনি দাবি করেন, কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন যে পোস্টটি সত্যিই তার আইডি থেকে করা হয়েছে, তবে তিনি দায় স্বীকার করবেন। তবে পরবর্তীতে ওই পোস্টটি আর তার প্রোফাইলে দেখা যায়নি।
দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, সিয়াম অতীতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিব হাসানকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন।
এদিকে ছাত্রদল নেত্রী তাওহীদা সুলতানা স্ক্রিনশটটি শেয়ার করে সিয়ামকে শিবির-সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করেন এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মানসুরা আলমসহ আরও অনেকে একই স্ক্রিনশট নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
এ ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করে আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাবেদ উল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, সিয়ামকে পূর্বের একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, এর আগে গত ২৩ এপ্রিল তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে ঘিরে এআই-নির্মিত ছবি ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য ব্যবহার করে একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে সেটিও ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। ওই সময় ডাকসু নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামেও ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
দ্য ডিসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, LE O, Ryan Draper এবং Aronno Abir নামের অ্যাকাউন্টগুলো আওয়ামী লীগের সাইবার নেটওয়ার্ক ‘ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব পরিচয়-গোপন অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক সাইবার অপরাধের অভিযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, সম্প্রতি দ্য ডিসেন্ট, এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির এবং কয়েকজন সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে ভুয়া রিপোর্ট করা হয়েছিল। পরে Ryan Draper ও Aronno Abir নামের অ্যাকাউন্টগুলো এসব অ্যাকাউন্ট ও পেজ অপসারণের কৃতিত্ব দাবি করে পোস্টও দেয়।
সিয়ামের গ্রেপ্তার, ভুয়া স্ক্রিনশটের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে ঘটনাটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সাইবার অপপ্রচারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]