জঙ্গল সলিমপুর: সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের পাহারায় দুর্গম এক অপরাধরাজ্য
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর—যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দাপট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা প্রশাসনের কোনো অভিযান মানেই সেখানে হামলা, সংঘর্ষ ও রক্তপাত।
তিন মাস আগে প্রথম আলো জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটেই আজ সেখানে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয় র্যাব। এতে একজন র্যাব কর্মকর্তা নিহত এবং তিনজন সদস্য আহত হন।
এই ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে—কয়েক দশক ধরে জঙ্গল সলিমপুরে চলমান অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা, প্লট বাণিজ্য এবং সশস্ত্র অপরাধচক্রের ভয়ংকর বাস্তবতা।
চার দশকের অবৈধ দখল ও পাহাড় কাটা
গত চার দশকে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে জঙ্গল সলিমপুরে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও চলছে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য। এই দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী।
এলাকাটি সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসীদের দ্বারা। এলাকাবাসীদের জন্য রয়েছে আলাদা পরিচয়পত্র। পরিচয়পত্র ছাড়া বাইরের কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এমনকি পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সেখানে ঢুকতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন।
নগরের ভেতরেই সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে, লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। প্রশাসনিকভাবে এটি সীতাকুণ্ডে হলেও বাস্তবে নগরের একেবারে সন্নিকটে।
সরকারি খাসজমি হওয়ায় এখানে কারাগার, আইটি পার্কসহ ১১টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবৈধ দখলদারদের কারণে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, লিংক রোডসংলগ্ন এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯–১০ লাখ টাকা। সে হিসেবে জঙ্গল সলিমপুরের জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের দখলে।
যেভাবে দখলের শুরু, যাঁরা নিয়ন্ত্রণে
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্যে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস প্রথম পাহাড় কেটে বসতি গড়েন। দখল টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। দুর্গম ভূপ্রকৃতির সুযোগে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে খাসজমি বিক্রি শুরু হয়।
শুরুতে দুই শতক জমি বিক্রি হতো মাত্র ২০ হাজার টাকায়। নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জমি কেনাবেচা চলত। প্লট ক্রেতাদের নিয়ে গঠন করা হয় তথাকথিত সমবায় সমিতি। বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধার নামে নিয়মিত চাঁদা আদায় চলত।
পরে প্লট বাণিজ্য ও দখল নিয়ে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন আলী আক্কাস। এরপর তাঁর সহযোগীরা—কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক—আলাদা আলাদা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে তোলেন।
খুনোখুনি ও আধিপত্যের লড়াই
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ১৪ মাসে অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সবগুলোর পেছনেই রয়েছে পাহাড়ি এলাকার দখল ও আধিপত্য বিস্তার।
চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ইউনিয়ন শ্রমিক দলের প্রস্তাবিত সভাপতি মীর আরমানকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ও আহত হয়েছেন অনেকে।
অস্ত্র কেনার অডিও ও প্লট বাণিজ্য
সম্প্রতি জঙ্গল সলিমপুর দখলকে কেন্দ্র করে ৬০ লাখ টাকার অস্ত্র কেনার অডিও কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বলছে, এতে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিনের কণ্ঠস্বর রয়েছে।
এদিকে আলীনগর এলাকায় চলছে প্রকাশ্য প্লট বাণিজ্য। প্রচারপত্র ছাপিয়ে, দালালের মাধ্যমে সরকারি পাহাড়ি জমি বিক্রি করা হচ্ছে। কেউ কেউ দাবি করছেন—২৬ হাজার প্লটের মধ্যে ২৩ হাজার ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।
অভিযান মানেই হামলা
জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গেলেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলার মুখে পড়ে।
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযানের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ওসিসহ আহত হন অন্তত ২০ জন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি ও সেপ্টেম্বর র্যাব ও পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে
পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানেও বারবার হামলা হয়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন,
“ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাহিনী ঢুকলেই পাহারাদাররা খবর দেয়। পাহাড়ের ওপর থেকে হামলা শুরু হয়। পরিকল্পিত যৌথ অভিযান ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।”

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]