নিরাপদ প্রস্থান ও দেশত্যাগের আশ্বাসে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, আগের কর্মকাণ্ডের দায় নেবে না বিএনপি
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পেছনে নিরাপদ প্রস্থান ও দেশত্যাগের নিশ্চয়তা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে একটি সমঝোতা কাজ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ, কেলেঙ্কারি ও মামলার দায়ভার বিএনপি নেবে না বলে দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দেশে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন যাতে অবাধে চলাফেরা করতে পারেন এবং পরবর্তীতে নিরাপদে দেশত্যাগ করতে পারেন, সে বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পরই তিনি পদত্যাগে সম্মত হন। তবে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া সিদ্ধান্তের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলেও, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কর্মকাণ্ডের কোনো দায় বিএনপি নেবে না।
বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের দ্রুত দেশত্যাগ করাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর জন্য নিরাপদ ও সুবিধাজনক বলে মনে করছে দলটি।
পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি নিজেই গণমাধ্যমকে বলেন, শারীরিক সুস্থতা কিছুটা ফিরে পেলেই আগামী ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি ‘টাইমস’কে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ ও বিএনপির সঙ্গে কথিত সমঝোতার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও আগে থেকেই অবহিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। জামায়াতের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে চাপ ছিল। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপিও তাঁকে আর রাষ্ট্রপতি পদে রাখতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত একটি ‘সম্মানজনক বিদায়ের’ পথ বেছে নেওয়া হয়।
তবে কৌশলগত কারণে বিএনপি নেতা ও সরকারের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণ হিসেবে তাঁর ‘গুরুতর অসুস্থতা’র বিষয়টিই সামনে আনছেন। স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন। এর বাইরে আর কিছু বলার নেই।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে তা খতিয়ে দেখা হবে। সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের দায় বিএনপি নেবে না বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে তাঁর ভূমিকা এবং বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে কথিত সম্পর্কের বিষয়গুলো রয়েছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০১৭ সালে সাহাবুদ্দিন জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যান হন। এই ঘটনাকে ইসলামী ব্যাংক দখলে এস আলম গ্রুপের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে করা মামলা বর্তমানে হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মো. সাহাবুদ্দিন। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তাঁর পদত্যাগ এবং স্পিকার কর্তৃক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আগামী সেপ্টেম্বরে বসতে যাওয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনেই দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
পদত্যাগের পর নিয়ম অনুযায়ী ভিভিআইপি প্রটোকল সুবিধা পেলেও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-সহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদের কারণে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, গুলশান-১ নম্বরের গ্রিন ভিলায় সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য একটি ফ্ল্যাট প্রস্তুত করা হচ্ছে। বঙ্গভবন ছাড়ার পর তিনি সেখানে উঠবেন। রাষ্ট্রপতির একান্ত সহকারী সচিব সাগর হোসেন জানিয়েছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি রবি বা সোমবারের মধ্যে গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে উঠতে পারেন।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]